বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন যে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এখন ‘অত্যন্ত সংকটময়’।
এই খবরে শুক্রবার গভীর রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ব্যাপক ভিড় করেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় তীব্র উৎকণ্ঠা।
রাতভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া করে স্ট্যাটাস দেন অসংখ্য মানুষ। হাসপাতালের সামনে মাঝরাতের পরও কমেনি মানুষের অপেক্ষা ও উদ্বেগ। অনেকে গণমাধ্যমে চোখ রেখে কাটিয়েছেন নির্ঘুম রাত। এদিকে একই সময়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব।
জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফুসফুসে সংক্রমণ এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে অবস্থার অবনতি হলে নিউমোনিয়া দেখা দেয়। সেই সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের জটিলতা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে ওঠে।
একটি রোগের চিকিৎসা করতে গেলে আরেকটি জটিল হয়ে ওঠায় চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়ার বিষয়েও ভাবছেন বলে জানা গেছে।
এমন অবস্থায় শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাতে খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং দেশের মানুষের প্রতি দোয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যেন কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়টিতে খালেদা জিয়া দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা—তাই তার সুস্থতা অতীব প্রয়োজন।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
একই রাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল হাসপাতাল থেকে ফিরে জানান যে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা মোটেই ভালো নয়। তিনি সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান বলেন, খালেদা জিয়া বর্তমানে সিসিইউতে মেডিকেল বোর্ডের নিবিড় তত্ত্বাবধানে আছেন। রাতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার হাসপাতালে গিয়ে তার খোঁজ নেন। এসময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলও উপস্থিত ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যায় খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়ার ঢল। জামায়াতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার স্ট্যাটাসে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন যেন খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং তার কষ্ট লাঘব হয়।
এদিকে রাত সাড়ে ৮টার দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পল্লী উন্নয়ন, সমবায় ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে পোস্ট দেন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিও ব্যক্তিগত অনুভূতি জানিয়ে খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন। তিনি লেখেন, শৈশব থেকে তার একমাত্র ইচ্ছা ছিল খালেদা জিয়ার আশীর্বাদ পাওয়া।
রাত ১২টার পর হাসপাতালে দাঁড়িয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মঈন খান জানান, মেডিকেল বোর্ড তার সবশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করেছে এবং প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা দিচ্ছে। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
গভীর রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, তারা কিছুটা দূর থেকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন, তিনি তাদের চিনেছেন এবং সালামের উত্তর দিয়েছেন। তিনি সবার কাছে খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য বিশেষ দোয়ার অনুরোধ জানান।
সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত হাসপাতালের সামনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। তবে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা বাইরে দাঁড়িয়ে খবর জানতে চেষ্টা করেন। শায়রুল কবির খান অনুরোধ করেন, চিকিৎসায় যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য ভেতরে ভিড় না করতে।
এর আগে দুপুরে নয়াপল্টন জামে মসজিদে দোয়া মাহফিলে বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান—খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়।
উল্লেখ্য, প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে বহুবিধ জটিল রোগে ভুগছেন—হৃদরোগ, লিভার সিরোসিস, কিডনি সমস্যা, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসুস্থতা রয়েছে তার।
গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিউমোনিয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ২৭ নভেম্বর তাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, বয়সের কারণে তার সুস্থ হতে সময় লাগছে। লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও ভার্চুয়ালি চিকিৎসা পরামর্শ দিচ্ছেন।






























