তিস্তা-পদ্মায় ব্যারাজ নির্মাণ ও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ঘোষণা তারেক রহমানের

তিস্তা-পদ্মায় ব্যারাজ নির্মাণ ও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ঘোষণা তারেক রহমানের ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী প্রতিনিধি

Published : ১৯:১০, ২০ অক্টোবর ২০২৬

তিস্তা ও পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পানির সংকট নিরসন এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে ১৪ জেলার মানুষ উপকৃত হবেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিএনপির প্রতি জনগণের সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এতে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

তারেক রহমান বলেন, দেশ গড়ার দায়িত্ব দেশের মানুষেরই। বিদেশ থেকে কেউ এসে বাংলাদেশের উন্নয়ন করে দেবে না। উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহল তৎপর রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি বিএনপির স্লোগান ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ তুলে ধরেন।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এ বিশ্বাস থেকেই কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সাত দিনের মধ্যে ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র, মাঝারি, প্রান্তিক ও বড় কৃষকদের কাছে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মোট ৪০ লাখ কৃষককে এ কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে অন্তত একটি ফসলের জন্য সার, বিষ ও কীটনাশক সরবরাহের চেষ্টা করা হবে, যাতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় ও দুর্ভোগ কমে। কার্ডধারী কৃষকেরা বিমা সুবিধা, ব্যাংকঋণ এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার সুযোগও পাবেন। কৃষক কার্ডে মোট ১০টি সুবিধা রাখা হবে বলে জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, উত্তরাঞ্চল দেশের শস্যভান্ডার হলেও এ অঞ্চলের কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকটে ভুগছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে বরেন্দ্র প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে খাল ও নদী খননের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে, যার মধ্যে ৮ হাজার কিলোমিটার খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানান।

তার ভাষ্য, খাল খননের ফলে কৃষকেরা পানি ও সেচের সুবিধা পাবেন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও সহায়তা হবে। কৃষি ও কৃষকদের সুরক্ষায় এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাজশাহীর হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্থানীয় নেতারা হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। বর্তমানে শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৩০০; সেটি বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ করার প্রস্তাব এসেছে।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার পাঁচ বছরের মধ্যে উপজেলা হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শহীদ জিয়াউর রহমান ৩০ শয্যার হাসপাতাল চালু করেছিলেন এবং ১৯৯১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তা বাড়িয়ে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। এবার ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে নারী ও মায়েদের চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। কিডনি রোগীসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য পৃথক শয্যার ব্যবস্থা করার কথাও জানান তিনি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই বিএনপির লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।

তারেক রহমান বলেন, জুন মাসে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। ডায়ালাইসিসের ওষুধের দাম কমানো হয়েছে এবং হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জামের ওপর কর কমানো হয়েছে। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ হয়ে থাকা প্রায় ৪৬টি কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে।

তিনি বলেন, সরকার বেকারত্ব কমাতে এবং দেশের নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তবে কয়েকটি দল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তারেক রহমানের ভাষ্য, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। জনগণের স্বার্থে নেওয়া উদ্যোগের বিরোধিতাকারীরা জনগণের প্রকৃত বন্ধু কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল খনন একটি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের বিরোধিতা করা হলে শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নারীশিক্ষা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, খালেদা জিয়া মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। বিএনপি মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভালো ফলাফল করলে উপবৃত্তির ব্যবস্থাও করা হবে। তবে শুধু শিক্ষিত করাই যথেষ্ট নয়, মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলাও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নির্বাচনের আগে দেওয়া ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এ কার্ডের মাধ্যমে পরিবারগুলোর কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। এ অর্থ সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পুঁজি গড়ে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরিতেও কাজে লাগতে পারে। এর মাধ্যমে দেশকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল বিএনপির নেওয়া এসব উদ্যোগ চায় না। জনগণকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। বিএনপি একাত্তর ও চব্বিশের চেতনাকে ধারণ করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলটি শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি দল প্রকাশ্যে চব্বিশের চেতনার কথা বললেও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা জানাতে তাদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর দাবি, কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই এমন রাজনৈতিক আচরণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। জনগণ স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে টিকিট বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছিল। বিশৃঙ্খলা এড়াতে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

জনসভায় ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির মধ্যে মোট ১২ কোটি ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা কৃষি প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে বোতাম চেপে তিনি এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। কৃষকদের মুঠোফোনে অর্থ পৌঁছানোর পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলেন তিনি। উপস্থিত নেতাকর্মীরাও একই ধ্বনিতে সাড়া দেন। এ সময় বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান বিএনপির নেতাকর্মীরা।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement