মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ডিজিটাল কমার্স: সংকট থেকে উত্তরণের পথ, ২৫ দফার রোড ম্যাপ। 

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ডিজিটাল কমার্স: সংকট থেকে উত্তরণের পথ, ২৫ দফার রোড ম্যাপ।  ছবি : সংগৃহীত

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা

Published : ১৫:২৫, ২৭ মার্চ ২০২৬

১৯৭৩ সালের 'অয়েল শক' যেভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করেছিল, বর্তমান ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার ত্রিভুজাকৃতির ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ঠিক একইভাবে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ও ডিজিটাল অর্থনীতির হৃদপিণ্ডে আঘাত হানছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তাপ কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং এটি 'এনার্জি ইকোনমি' ও 'ডিজিটাল কমার্স'-এর ওপর এক বিশাল বৈশ্বিক আঘাত। ‘হরমুজ প্রণালী’—যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ এলএনজি এবং ২১% তেল পরিবাহিত হয়—সেই কৌশলগত জলপথটি আজ রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার শঙ্কায়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্থিরতা বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতের মেরুদণ্ড ভাঙার উপক্রম করছে, অন্যদিকে ডলারের অস্থিতিশীলতায় আমদানি-নির্ভর ই-কমার্সের মুনাফা আজ শূন্যের কোঠায়। এই বৈশ্বিক সুনামির মাঝে বাংলাদেশের ৫ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শিপিং ফ্রেইট কস্টের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা আমাদের উদীয়মান ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতকে ঠেলে দিয়েছে এক গভীর সংকটের মুখে।

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও বাংলাদেশের জ্বালানি সমীকরণ : 
বিগত দশকগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বৃদ্ধিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম গড়ে ১০% থেকে ১৫% তাৎক্ষণিক বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ রূপ নিলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ থেকে ১২০ ডলার ছাড়াতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতের শতভাগ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর প্রাক্কলন মতে, তেলের দাম ১০% বাড়লে উন্নয়নশীল দেশে পরিবহন ব্যয় (Logistic Cost) ১৫%-২০% বৃদ্ধি পায়। ই-কমার্সের প্রাণ ‘লাস্ট-মাইল ডেলিভারি’র ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচ বাড়লে ক্রেতার ওপর অতিরিক্ত চার্জের বোঝা চাপে। দেখা গেছে, ডেলিভারি চার্জ ৫০ থেকে বেড়ে ৭০-৮০ টাকা হলে অনলাইন অর্ডার প্রায় ১২% কমে যায়। বর্তমানে লোহিত সাগরের অস্থিরতায় জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে আসতে হওয়ায় শিপিং সময় গড়ে ১০-১৫ দিন এবং কন্টেইনার প্রতি খরচ প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানিকারকদের জন্য এক বড় ধাক্কা।
মুদ্রাস্ফীতি ও কনজিউমার বাস্কেটের পরিবর্তন : 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে, দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার ইতোমধ্যে ৯.৫% ছাড়িয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন খরচ বা 'ফ্রেইট ইনডেক্স' বাড়লে আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বাড়বে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে ডাবল ডিজিটে (১০% এর উপরে) নিয়ে যেতে পারে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে ক্রেতারা ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করছেন; ফলে গত এক বছরে ই-কমার্সে 'নন-এসেনশিয়াল' বা শৌখিন পণ্যের বিক্রয় ৩০%-৪০% হ্রাস পেলেও গ্রোসারি বা নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের মান শক্তিশালী হওয়ায় (Dollar Index বৃদ্ধি) বাংলাদেশে এলসি জটিলতা ও টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন ঘটছে, যা ই-কমার্স আমদানিকারকদের ল্যান্ডিং কস্ট প্রায় ২৫% বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বার্ষিক ৮৫ হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল ট্রানজেকশন বাজারটি মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের অস্থিরতায় গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও এফ-কমার্সের ডাটাভিত্তিক বিশ্লেষণ : 
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির মূল শক্তি তৃণমূলের উদ্যোক্তারা। বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা করছেন, যার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। লোহিত সাগরের অস্থিরতায় জাহাজ ঘুরে আসায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের 'ইনভেন্টরি টার্নওভার' কমিয়ে নগদ অর্থের প্রবাহ (Cash Flow) বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার বাড়ায় ফেসবুক ও গুগলের বিজ্ঞাপন খরচ (Cost Per Click) উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে; ফলে একই বাজেটে আগের চেয়ে ২০% কম মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে। এতে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুনাফা সংকুচিত করছে।
৪. পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাস: ই-কমার্স কোন পথে?
Center for Digital Commerce Research and Advocacy (CDCRA) ও গ্লোবাল রিসার্চ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বাংলাদেশের ২২ হাজার কোটি টাকার ই-কমার্স বাজারটি বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবে লক্ষ্যমাত্রার ২০% প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাধার মুখে পড়বে। সংঘাত ৬ মাসের বেশি স্থায়ী হলে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন কস্ট ইনডেক্স (GSCPI) অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশের ই-কমার্স খাতে ইনভেন্টরি কস্ট প্রায় ৩০% বাড়তে পারে। স্টার্টআপ জেনোম-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীরা 'রিস্কি অ্যাসেট' থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশের বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সুবিধা ও অসুবিধা (Impact Analysis) : 
বৈশ্বিক এই অস্থিরতা বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি কিছু দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবও তৈরি করছে। অসুবিধার মধ্যে রয়েছে পণ্যের সোর্সিং টাইম (Lead Time) বৃদ্ধি, ফ্রেইট ইনডেক্স বাড়ায় আমদানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে কেনাকাটা কমে যাওয়া। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এটি দেশীয় ব্র্যান্ড (Local Brands) এবং হাইপার-লোকাল কমার্স জনপ্রিয় করার সেরা সময়। আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়লে মানুষ বিকল্প হিসেবে দেশীয় কুটির শিল্প ও দেশজ পণ্যের দিকে ঝুঁকবে। এছাড়া সংকটের চাপে ব্যবসায়ীরা অপারেশনাল খরচ কমাতে শিখে অটোমেশনের দিকে ঝুঁকবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়িক দক্ষতা (Efficiency) বৃদ্ধি করবে।
উত্তরণের পথ ও "স্মার্ট ইকোনমি" রোডম্যাপ : 
এই বৈশ্বিক দুর্যোগে ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো এখন বাধ্যতামূলক:
 * দেশীয় সোর্সিং (Local Sourcing): আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে 'Made in Bangladesh' পণ্য নিয়ে কাজ করলে বৈশ্বিক সংকটে টিকে থাকার হার আমদানিকারকদের চেয়ে ৪ গুণ বেশি হয়।
 * প্রযুক্তি ও ইনসেনটিভ: এআই-চালিত লজিস্টিকস ব্যবহার করে জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। ই-কমার্স খাতের জন্য বিশেষ 'ফুয়েল সাবসিডি কার্ড' বা 'লজিস্টিকস রিবেট' এর ব্যবস্থা করা জরুরি।
 * নীতিনির্ধারণী ভূমিকা : Center for Digital Commerce Research and Advocacy (CDCRA) কে নীতিনির্ধারকদের সাথে কাজ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য লো-ইন্টারেস্ট লোন বা ডিজিটাল কমার্স বন্ড প্রবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি 'ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স' নীতি সহজীকরণ এবং ডিজিটাল পেমেন্টে ক্যাশব্যাক বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা রাখা প্রয়োজন।
এই সংকট উত্তরণে এবং উদ্যোক্তাদের টেকসই সুরক্ষায় সামগ্রিক বিবেচনায় আমি একটি পূর্ণাঙ্গ '২৫-দফা মাস্টার প্ল্যান' প্রণয়ন করেছি, যা এই নিবন্ধের শেষে বিস্তারিত সংযুক্ত করা হলো।

বর্তমান বাস্তবতায় ই-কমার্স দেশের আধুনিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক সুনামির ঢেউ আমাদের উপকূলে আছড়ে পড়ছে। তবে সংকটই উদ্ভাবনের জননী। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে যদি আমরা দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঠিক ডিজিটাল ব্যাকবোন দিতে পারি, তবেই এই ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত ঘুরে দাঁড়াবে। স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে এই ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
 ই-কমার্স ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সুরক্ষা: ২৫-দফা মাস্টার প্ল্যান : 
১. ই-কমার্স ডেলিভারি যানবাহনের জন্য বিশেষ 'ফুয়েল সাবসিডি কার্ড' প্রবর্তন।
২. লজিস্টিকস খরচ নিয়ন্ত্রণে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর জন্য জ্বালানি রিবেট প্রদান।
৩. যানজট এড়াতে ই-কমার্স লজিস্টিকসের জন্য আলাদা রুট বা অগ্রাধিকার প্রদান।
৪. পরিবেশবান্ধব ডেলিভারি উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক ভেহিকেল (EV) আমদানিতে শুল্ক ছাড়।
৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা।
৬. ই-কমার্স খাতের তারল্য সংকট মেটাতে সরকারিভাবে 'ডিজিটাল কমার্স বন্ড' চালু করা।
৭. অন্তত ৫ বছরের জন্য ই-কমার্স স্টার্টআপগুলোর ওপর থেকে ট্যাক্স হলিডে প্রদান।
৮. ট্রেড লাইসেন্স এবং ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সহজীকরণ।
৯. ফেসবুক ভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ 'উদ্যোক্তা আইডি' কার্ড প্রদান।
১০. বিজ্ঞাপন খরচের (Ad Cost) ওপর ভ্যাট কমানো এবং ডলার পেমেন্টে বিশেষ সুবিধা প্রদান।
১১. জেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে 'স্মার্ট লজিস্টিকস হাব' ও ওয়্যারহাউজ তৈরি করা।
১২. নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অনুদান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
১৩. আমদানিনির্ভরতা কমাতে 'Made in Bangladesh' পণ্যের জন্য ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে আলাদা ক্যাটাগরি বাধ্যতামূলক করা।
১৪. গ্রামীন হস্তশিল্প ও কুটির শিল্পকে সরাসরি ই-কমার্সের সাথে যুক্ত করতে 'ওয়ান ভিলেজ ওয়ান ডিজিটাল শপ' প্রকল্প।
১৫. কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা প্রদান।
১৬. পণ্য সোর্সিং সহজ করতে বিসিক (BSCIC) এর সাথে ই-কমার্স খাতের সমন্বয়।
১৭. ই-কমার্স খাতের বিবাদ মেটাতে দ্রুতগতির 'ডিজিটাল কমার্স ট্রাইব্যুনাল' গঠন।
১৮. ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স (পণ্য রপ্তানি) সহজ করতে রপ্তানি নীতি সংস্কার।
১৯. পেমেন্ট গেটওয়ে চার্জ কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করা।
২০. পণ্য ফেরত (Return Policy) সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে সুনির্দিষ্ট লজিস্টিকস গাইডলাইন।
২১. ই-কমার্স খাতের রিয়েল-টাইম ডাটা সংগ্রহের জন্য একটি 'ন্যাশনাল ই-কমার্স ডাটা সেন্টার' তৈরি।
২২. উদ্যোক্তাদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের প্রশিক্ষণ।
২৩. ই-কমার্স শিক্ষাকে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।
২৪. ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতে অটোমেটেড কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
২৫. আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় ই-কমার্স ব্র্যান্ডগুলোর ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণায় সরকারি সহায়তা।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement