বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: সোনালী স্বপ্নের উত্থান ও রূঢ় বাস্তবতার ময়নাতদন্ত

বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: সোনালী স্বপ্নের উত্থান ও রূঢ় বাস্তবতার ময়নাতদন্ত ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০০:১১, ৭ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে স্বপ্নটি ২০১০ সালে একমুঠো সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল, তা ২০২৪-২৫ সালে এসে এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

এটি কেবল গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি অপরিপক্ক বাজার ব্যবস্থার সামগ্রিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

সূচনালগ্ন এবং সম্ভাবনার উন্মেষ (২০১০-২০১৯) : 

বাংলাদেশের স্টার্টআপ যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের হাত ধরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সূচনা এবং পরবর্তীতে 'বিকাশ'-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হওয়া এই খাতের জন্য সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

এই প্রাথমিক পর্যায়ে 'পাথাও', 'চালডাল', 'সেবা এক্সওয়াইজেড' এবং 'শপআপ' তাদের যাত্রা শুরু করে একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের স্বপ্ন নিয়ে।
২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছিল মূলত অবকাঠামো নির্মাণের সময়।

তখন ফোর-জি ইন্টারনেটের বিস্তার এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা স্টার্টআপগুলোকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। এই সময়ে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এলেও তা ছিল মূলত রাইড শেয়ারিং ও ই-কমার্সে সীমাবদ্ধ।

কিন্তু বাজারটি তখনো ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর, যা পরবর্তী বড় ঢেউ সামলানোর জন্য প্রস্তুত ছিল না। এই সময়কালেই স্টার্টআপগুলোর সম্মিলিত মার্কেট ভ্যালুয়েশন বা বাজার মূল্য কাগজে-কলমে কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও, বাস্তব জিডিপিতে এর অবদান এবং টেকসই আয়ের উৎস তৈরির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল।

করোনা মহামারী ও বিনিয়োগের বিভ্রম (২০২০-২০ ২০২১) : 

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে চলা লকডাউন বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর জন্য এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করে। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অনলাইন গ্রোসারি, ডিজিটাল শিক্ষা এবং লজিস্টিকস সেবার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই কৃত্রিম চাহিদাকে স্থায়ী মনে করে অনেক স্টার্টআপ তাদের অপারেশনাল ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

২০২১ সালে এই খাতের ইতিহাসে রেকর্ড ব্রেকিং ৪১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আসে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী যেমন সফটব্যাংক ও টাইগার গ্লোবাল বাংলাদেশে অর্থ ঢালতে শুরু করে। কিন্তু এই বিনিয়োগের পেছনে যে 'ক্যাশ বার্ন' বা টাকা পুড়িয়ে গ্রাহক ধরার নেশা ছিল, তা মূলত একটি বুদ্বুদ বা 'বাবল' তৈরি করেছিল।

স্টার্টআপগুলো লাভের চেয়ে গ্রোথ বা প্রবৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল, যা ছিল একটি বড় স্ট্র্যাটেজিক ব্লান্ডার। এই জোয়ারের সময় বাজার মূলধনের যে উল্লম্ফন দেখা যায়, তা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব আয়ের চেয়ে অনেক বেশি ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল।
বর্তমান বিপর্যয়: বড় নামগুলোর পতন ও বিবিধ খাতের প্রতিবন্ধকতা : 

২০২২-এর মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সময়কালটি বাংলাদেশের স্টার্টআপের জন্য একটি 'কালবেলা'। কেবল চালডাল বা সেবা এক্সওয়াইজেড নয়, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। এর পেছনের কারণগুলো যেমন আর্থিক, তেমনি পদ্ধতিগত।

গ্লোবাল ফান্ডিং উইন্টার ও স্থানীয় পুঁজির অভাব: 

বাংলাদেশের স্টার্টআপ বিনিয়োগের প্রায় ৯৫% বিদেশি নির্ভর। বিশ্ববাজারে সুদের হার বৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান বাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে।

আমাদের স্থানীয় বড় কর্পোরেট হাউস এবং বিত্তশালী ব্যক্তিরা (Angel Investors) এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত না থাকায় স্টার্টআপগুলোর হাতে অপারেশন চালানোর মতো আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।

মূলত বাংলাদেশের স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক ভয় কাজ করে, কারণ দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট 'এক্সিট পলিসি' বা আইপিও-তে যাওয়ার সহজ পথ নেই। বিনিয়োগ করা টাকা কীভাবে এবং কখন ফেরত আসবে, তার আইনি নিশ্চয়তা না থাকায় স্থানীয় ক্যাপিটাল মার্কেট স্টার্টআপগুলোর প্রতি বিমুখ।

খাতভিত্তিক প্রতিবন্ধকতা ও সামগ্রিক সংকট:

 * ই-কমার্স ও লজিস্টিকস: ইভ্যালি বা ধামাকার মতো ঘটনার পর আস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছে আজকের ডিল বা প্রিয়শপ-এর মতো পুরনো প্লেয়ারদের ওপরও।

লজিস্টিকস খাতে পেপারফ্লাই-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের সংকটে পড়া স্পষ্ট করে যে, সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে পেমেন্ট সংকট প্রকট। এটি একটি 'ইকোসিস্টেম বার্নআউট' তৈরি করেছে; যখন একটি লজিস্টিকস কোম্পানি ধুঁকে পড়ে, তখন তার সাথে যুক্ত শত শত ক্ষুদ্র ই-কমার্স উদ্যোক্তা তাদের পণ্য সময়মতো ডেলিভারি করতে না পেরে ব্যবসা হারাচ্ছেন।

 * এডুটেক ও ফিনটেক: শিখো বা টেন মিনিট স্কুল বড় বিনিয়োগ পেলেও স্কুল-কলেজ খোলার পর গ্রাহক ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ফিনটেক স্টার্টআপগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সিং জটিলতা এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে ব্যাংকিং খাতের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

 * এগ্রিটেক ও হেলথটেক: আইফার্মার বা ফাসল-এর মতো কৃষিবান্ধব উদ্যোগগুলো মাঠ পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং পচনশীল পণ্যের সংরক্ষণাগারের অভাবে স্কেল করতে পারছি না। হেলথটেক খাতে মানুষের সশরীরে ডাক্তার দেখানোর প্রবণতা এখনো অনলাইন কনসালটেশনের চেয়ে অনেক বেশি।

ত্রুটিপূর্ণ ইউনিট ইকোনমিক্স ও সাপ্লাই চেইন সংকট: 

চালডাল বা সেবা এক্সওয়াইজেড-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে দেখা গেছে, প্রতিটি সার্ভিস প্রদান করতে তাদের খরচ লাভের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। বিনিয়োগের টাকা দিয়ে এই গর্ত ভরাট করা সম্ভব হলেও, টাকা ফুরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই মডেলটি ভেঙে পড়েছে।

সেবা এক্সওয়াইজেড-এর হাজার হাজার ক্ষুদ্র সার্ভিস পার্টনার (প্লাম্বার, টেকনিশিয়ান) আজ আয়ের পথ হারিয়েছেন, যার সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এটিই হলো মার্কেট ভ্যালুয়েশন বনাম বাস্তব গ্রাউন্ড ইমপ্যাক্টের অমিল—যেখানে কাগজে কোম্পানি বড় হলেও সাধারণ মানুষের আয়ে তা স্থিরতা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ট্যালেন্ট ড্রেইন ও আস্থার সংকট: 

স্টার্টআপগুলো কর্মী ছাঁটাই শুরু করার ফলে দেশে একটি বড় ধরনের 'ব্রেইন ড্রেইন' শুরু হয়েছে। গত দুই বছরে প্রায় ১৫,০০০ দক্ষ প্রযুক্তি কর্মী তাদের চাকরি হারিয়েছেন বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যর্থতা:

ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এমনকি ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এই মন্দায় টিকে থাকতে পারলেও বাংলাদেশ কেন পারল না, তার মূল কারণ 'পলিসি সাপোর্ট'। ওই দেশগুলোতে সরকার স্টার্টআপের জন্য 'সফট লোন' এবং ইনকিউবেশন সুবিধা নিশ্চিত করেছে।

আমাদের দেশে 'স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড' চেষ্টা করলেও আইনি জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সময়মতো মূলধন পায়নি। এছাড়া অধিকাংশ দেশীয় স্টার্টআপ বিদেশি 'কপি-পেস্ট' মডেলে চলায় তারা এদেশীয় তৃণমূল মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যতের রূপরেখা : 

এই পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনের জন্য কিছু কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে:

 * ডিফল্ট এলাইভ ও প্রফিট ফার্স্ট: বিনিয়োগের আশায় না বসে প্রথম দিন থেকেই আয়ের পথ নিশ্চিত করতে হবে।

 * মার্জার ও একীভূতকরণ: শপআপ ও সৌদি সারির (Sary) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে একীভূত হচ্ছে, সেটিই হতে পারে বাঁচার পথ। ছোট ছোট স্টার্টআপগুলোকে টিকে থাকতে হলে একে অপরের শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।

 * লোকাল ইনভেস্টমেন্ট ও সুশাসন: ব্যাংক ও বড় শিল্প গ্রুপগুলোকে স্টার্টআপে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের জন্য ট্যাক্স রিবেট সুবিধা চালু করতে হবে। প্রতিটি পয়সার খরচে স্বচ্ছতা ও অডিট নিশ্চিত করা অপরিহার্য। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে দ্রুত একটি আইনি কাঠামো ও এক্সিট ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ চিত্রটি বর্তমানে বিষাদময় মনে হলেও এটি মূলত একটি 'শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া'। যারা কেবল বিনিয়োগের টাকায় বিলাসিতা করেছিল এবং অবাস্তব মডেল নিয়ে কাজ করছিল, তারা ঝরে যাচ্ছে।

কিন্তু এই সংকটের ছাই থেকেই এমন কিছু স্টার্টআপ উঠে আসবে যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপারেশনাল খরচ কমিয়ে প্রকৃত লাভজনক ব্যবসা তৈরি করবে।

২০২৬-২৭ সালের মধ্যে আমরা হয়তো একটি পরিপক্ক ডিজিটাল অর্থনীতির দেখা পাব, যা আর কেবল অনুমানের ওপর নয়, বরং বাস্তব ডাটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর সমাধান এবং সরাসরি আয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement