ফ্রান্সে বিক্ষোভে সহিংসতা, অভিবাসননীতিকে দায়ী ভ্যান্সের; ট্রাম্পের রসিকতা
Published : ১৫:১৪, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সংকট, বেকারত্ব ও সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের পরিস্থিতির জন্য অভিবাসননীতিকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে, বিক্ষোভ নিয়ে রসিকতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অধিকাংশ স্থানে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাতে প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা প্যারিসে দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন। লিওঁ শহরের পর্যটন দপ্তরে আগুন দেওয়া হয়। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে আগুনে ১৪৩ বছরের পুরোনো সিটি হলের চূড়া ধসে পড়ে।
রোববার বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমলেও বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটে। প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। সপ্তাহান্তের শেষে প্যারিসকে ‘যুদ্ধক্ষেত্রের’ মতো মনে হচ্ছিল বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন শহরটিতে আসা এক দর্শনার্থী।
সেপ্টেম্বরে প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনের সূত্রপাত। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের দাবিতে শুরু হওয়া ওই কর্মসূচির দাবি মেনে নেওয়া হলেও পরে আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।
শনিবার প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে ফ্রান্সের একটি বড় ট্রেড ইউনিয়নের ৫৭ বছর বয়সী সদস্য মারিয়া পালাস সিএনএনকে বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় মানুষ ক্ষুব্ধ। তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা কিছুই পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্যারিসের ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা পাওলা ফোরমেন্তি বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভকে ‘ন্যায্য’ বলে উল্লেখ করেন। তবে সহিংসতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি এড়াতে মানুষের অভিযোগের জবাব দেওয়া এবং তাঁদের কথা শোনা জরুরি।
রোববারের ভাষণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের কথা স্বীকার করেন। জ্বালানির মূল্য মোকাবিলা এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ’ নেওয়ার কথা জানান তিনি। তবে এসব উদ্যোগ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেননি।
ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবাদ করেন। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে শনিবার কয়েক হাজার মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে মিছিল করেন। ইতালির মিলানে টানা দুই রাত অস্থিরতা চলে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছোড়েন ও সুপারমার্কেটে লুটপাট চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
আলবেনিয়ায় কথিত সরকারি দুর্নীতির প্রতিবাদে কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভ চলছে। সপ্তাহান্তে রাজধানী তিরানায় আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। একটি ছবিতে এক ব্যক্তিকে দাঙ্গা পুলিশের দিকে পেট্রলবোমা ছুড়তে দেখা গেছে। বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিমোজ শহরের আগুনে জ্বলতে থাকা সিটি হলের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য তিনি ব্যর্থ অভিবাসননীতিকে দায়ী করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জর্জিয়ায় এক সমাবেশে ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রসঙ্গ তোলেন। রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে ৫ হাজার ডলার লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘চলুন ফ্রান্সে যাই, বিপ্লবে যোগ দিই এবং সেখানে আমাদের ৫ হাজার ডলার খরচ করি।’
ফ্রান্সের এই বিক্ষোভ ও পরবর্তী পরিস্থিতি আগামী বসন্তে দেশটির নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেনের অভিযোগ, ‘ন্যায্য সামাজিক অসন্তোষকে আবারও কট্টর বামপন্থীরা জিম্মি করেছে।’ অন্যদিকে, কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশো শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকারের পক্ষে বারবার বক্তব্য দিয়েছেন।
































