সহিংসতা ও লুটপাট ঠেকাতে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে স্থানীয় কারফিউ
Published : ১০:৩৪, ২০ অক্টোবর ২০২৬
বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের একাধিক শহরে স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারি করেছে সরকার। প্যারিসের পাশাপাশি লিল, নিসসহ বিভিন্ন শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেনি সরকার।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্যারিসে এক আদেশের মাধ্যমে কারফিউ জারি করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়েন লেকোর্নু। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আপাতত জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরিবর্তে নির্দিষ্ট এলাকায় সীমিত পরিসরে কারফিউ কার্যকর করাই বেশি যুক্তিসংগত।
প্যারিস পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্লাস দে লা রিপাবলিক ও লে হাল এলাকায় রাত ১১টা থেকে কারফিউ কার্যকর করা হয়েছে। এসব বিধিনিষেধ মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বহাল থাকার কথা। নির্ধারিত এলাকায় নিয়ম কার্যকর করতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে সোমবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে প্যারিস পুলিশ।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় মেয়রদের সম্মতিতে লিল, দুয়ে, ওয়াটিনি ও দেনেইন শহরে মঙ্গলবার ও বুধবার অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলে রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নিসের মেয়র এরিক সিওত্তি এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে রাতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে তিনি কারফিউ আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। মার্সেই শহরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ। এ পরিস্থিতিতে আগামী ৫ নভেম্বর নতুন করে ধর্মঘট ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলো।
গত শনিবার ও রোববার ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, লুটপাট ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর আগে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিলেন। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় মাস আগে এই অস্থিরতা দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপকে আরও সামনে এনেছে। দুর্বল অর্থনীতি এবং ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের বোঝা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
কট্টর বামপন্থিদের দায়ী করলেন লেকর্নু
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুতর অস্থিরতার জন্য কট্টর বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু। সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আসলে একটি উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা—সহজ কথায় বলতে গেলে—প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়।”
লেকর্নুর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ চেয়েছেন উগ্র বামপন্থি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তার স্বপক্ষে প্রমাণ দিতে হবে তাকে। অন্যথায় তার উচিত ক্ষমা চাওয়া, চুপ থাকা এবং অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢালা বন্ধ করা।”
ফ্রান্সের খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফেডারেশন অব ট্রেড অ্যান্ড রিটেইলের হিসাবে, শনিবার ও রোববার প্যারিসসহ দেশজুড়ে প্রায় ৩ হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, লুটপাটের কারণে ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হারিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও করছাড়ের ব্যবস্থাও দাবি করেছে সংগঠনটি।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিস্থিতিতে কর্মীদের সাময়িকভাবে কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য ‘ফার্লো’ সহায়তা ব্যবস্থা চালু করবে সরকার।
মার্সেই শহরে দুটি পোশাকের দোকানের ব্যবস্থাপক জেরার্ড নুচি অভিযোগ করেছেন, লুটপাট ঠেকানোর জন্য ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ ছিল না। তাঁর দোকানের সামনের অংশ কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। নুচি বলেন, “তারা সবকিছু তছনছ করেছে, ভাঙচুর চালিয়েছে এবং আমাদের অপমান করেছে। মনে হচ্ছিল যেন সত্যিকারের এক টর্নেডো বয়ে গেছে।”
জুনিয়র ডিজিটাল মন্ত্রী অ্যান লে হেনানফ এক্সে জানিয়েছেন, লুট করা পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলতে সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এসব পণ্যের বিক্রেতাদের আইনের আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার এক বিক্ষোভকারী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স

































