জাতিসংঘে বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন তারেক রহমান

জাতিসংঘে বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন তারেক রহমান ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৯:২২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বশান্তি, মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের অধিকার, বিশ্বশান্তি এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় দিনের কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

মাহদী আমিন জানান, তৃতীয় দিনে বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জাতীয় অগ্রাধিকারের পাশাপাশি শিশু, নারী, তরুণসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড প্রবর্তনের পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও পরিবেশ—জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন খাতে সরকারের পরিকল্পনার সামগ্রিক রূপরেখাও বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে গণতন্ত্র সুসংহত করা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মাহদী আমিনের ভাষ্য, ২০ মিনিটের বেশি সময়ের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
তৃতীয় দিনের কর্মসূচিতে পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তারেক রহমান। বৈঠকগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জলবায়ু মোকাবিলায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা
জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। মাহদী আমিন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

এসব পরিকল্পনার মধ্যে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল পুনঃখনন এবং পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য সামনে রেখে চারটি প্রস্তাবও উপস্থাপন করেছেন তিনি। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং অভিযোজন ও সহনশীলতা তৈরিতে অর্থায়নের গুরুত্বও বাংলাদেশের অবস্থানে উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্যসেবায় এক লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

আগামী কয়েক বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে ৮০ হাজার নারী থাকবেন। পাশাপাশি মিডওয়াইফারি সেবায় ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গুতেরেসের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বাংলাদেশ-জাতিসংঘ সহযোগিতা এবং বিশ্ব ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

এবারের জাতিসংঘ সফরে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সংকটটির টেকসই সমাধান এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়।

এর এক দিন আগে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এক আয়োজনে সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি জোরদার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।

ধারাবাহিক কূটনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী
মাহদী আমিন বলেন, এবারের জাতিসংঘ সফরের প্রতিটি দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, বহুপাক্ষিক আয়োজন, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক এবং বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেছে।

সফরের শেষ কর্মদিবসেও প্রধানমন্ত্রীর একাধিক কর্মসূচি রয়েছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক কূটনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম দিন নির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে ১০টিতে সরাসরি অংশ নেন তিনি। ওই দিন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement