হিলারি ক্লিনটনের হাত থেকে সম্মাননা পেলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস
Published : ১৬:০৯, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
শান্তিতে নোবেলজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির আনুষ্ঠানিক তথ্যেও ইউনূসকে এ বছরের পুরস্কারপ্রাপ্তদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বছর ড. ইউনূস ছাড়াও সম্মাননাটি পেয়েছেন ভারতের সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের (সেবা) পরিচালক রিমা নানাবতী এবং ফ্যাশন ডিজাইনার ও টোরি বার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ। এ ছাড়া জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান পেয়েছেন জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড।
অনুষ্ঠানে হিলারি ক্লিনটন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ড. ইউনূসের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতায়নের সুযোগ তৈরি হওয়ার বিষয়টি তিনি নিজে দেখেছেন। তাঁর মতে, ইউনূসের কাজ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুরস্কার গ্রহণের পর বক্তব্যে ড. ইউনূস তাঁর কাজের ৫০ বছরের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই আয়োজন বাংলাদেশের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোকে অনুপ্রাণিত করবে।
ক্ষুদ্রঋণ ও নারীর ক্ষমতায়ন
ড. ইউনূস বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়া এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে তাঁদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা নারীরা এখন নিজেদের প্রয়োজন ও সমস্যার কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরেন। ব্যাংকটির মালিকানাও ঋণগ্রহীতাদের হাতে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ঋণগ্রহীতাদের সন্তানদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা।’ নিজের ব্যবসা গড়ে তোলার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ওপরও জোর দেন তিনি।
সামাজিক ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবা
সামাজিক ব্যবসার ধারণা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, এ ধরনের ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন নয়; বরং সামাজিক সমস্যার সমাধান করা। তিনি জানান, সামাজিক ব্যবসার তহবিলের সহায়তায় বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ পুনরায় স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উদ্যোক্তা তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে ড. ইউনূস বলেন, শিক্ষার্থীদের কেবল চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি করার পরিবর্তে সৃজনশীল ও উদ্যোগী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত উদ্যোক্তা তৈরি করা।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালুর আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করবে এবং ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নসহ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।
ড. ইউনূসের ভাষ্য, ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ—গড়ে তোলার ধারণা বাস্তবায়নেও বিশ্ববিদ্যালয়টি ভূমিকা রাখতে পারে।
































