চিকিৎসাসেবা থেকে শিক্ষা সহায়তা: জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭ বছরের মানবিক অভিযাত্রা
Published : ১৫:৪২, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
মানবসেবা, জনকল্যাণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন (জেডআরএফ)। প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ ২৭ বছরের পথচলায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাবৃত্তি, কৃষি সহায়তা, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং জরুরি মানবিক সহায়তার মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ফাউন্ডেশন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানের বাণীসহ সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে মানবিক সেবা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রত্যয়।
স্বাস্থ্যসেবায় অসহায় মানুষের পাশে
জেডআরএফের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হলো আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেডিক্যাল ক্যাম্প আয়োজনের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
খুলনার রূপসা, ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও কড়াইল, গাজীপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর বগুড়ায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থানসংলগ্ন এলাকায় ফাউন্ডেশনের ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পে প্রায় সাত হাজার রোগী সেবা গ্রহণ করেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠোঁটকাটা, তালুকাটা ও দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায়ও বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে ফাউন্ডেশনের। জার্মান বিশেষজ্ঞ সার্জনদের সহযোগিতায় বগুড়া, খুলনা ও গাইবান্ধায় আয়োজিত প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার ক্যাম্পে প্রায় ৪৫০ জন রোগী বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের সুযোগ পেয়েছেন বলে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমসংক্রান্ত বিবরণে জানানো হয়েছে।
অ্যাজমা রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২০০৩ সালে বগুড়া এবং ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে অ্যাজমা সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনা বা রাজনৈতিক সহিংসতায় হাত-পা হারানো ব্যক্তিদের কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন এবং আহত ও অসুস্থ মানুষের পুনর্বাসনেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
করোনাকালে জরুরি সহায়তা
কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল, তখন জেডআরএফের চিকিৎসক, কৃষিবিদ ও বিভিন্ন পেশার স্বেচ্ছাসেবকেরা আক্রান্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন সিলিন্ডার, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী, ওষুধ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঘরে অবস্থানরত মানুষের জন্য চালু করা হয় হটলাইনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা।
এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, মশারি বিতরণ, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য বিশেষায়িত মেডিক্যাল ক্যাম্প এবং শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাবৃত্তি ও বিজ্ঞানচর্চায় গুরুত্ব
শিক্ষাক্ষেত্রে জেডআরএফের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর একটি হলো অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান। ২০০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির মাধ্যমে আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের সহায়তা দেওয়া হয়। ফাউন্ডেশনের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পুনরায় বৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ১৯ জন সন্তানকে শিক্ষা উপবৃত্তি দেওয়া হয়।
দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, জিপিএ-৫ অর্জনকারীদের বৃত্তি এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত সুরভি স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা এবং বগুড়ার মূক ও বধির স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে চক্ষু ক্যাম্প আয়োজনের উদ্যোগও ফাউন্ডেশনের মানবিক কার্যক্রমের অংশ।
বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন চর্চায় তরুণদের সম্পৃক্ত করতে আয়োজন করা হচ্ছে বিজ্ঞান মেলা ও উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা। ‘ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীর খোঁজে’ শীর্ষক বিজ্ঞান মেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নতুন ধারণা, বৈজ্ঞানিক প্রকল্প ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ‘আইডিয়া ফেস্ট ২০২৫’ মিনি হ্যাকাথনের মাধ্যমে তরুণদের দেশের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে উদ্ভাবনী সমাধান উপস্থাপনে উৎসাহিত করা হয়। ফাউন্ডেশনের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় বিজ্ঞান মেলা ‘ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীর খোঁজে ২০২৬’ আয়োজনের উদ্যোগও রয়েছে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন
প্রান্তিক মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক কার্যক্রমে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ও গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ ছিল। এসব সহায়তার মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারকে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়।
কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতেও কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিনামূল্যে ভেটেরিনারি মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে গবাদিপশুর চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ময়মনসিংহের সুতিয়াখালী ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর সিলেটের গোয়াইনঘাটেও ভেটেরিনারি সেবা ও কৃষি সহায়তামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয় বলে ফাউন্ডেশনের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
কৃষকদের মধ্যে ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ এবং আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, প্রাণিসম্পদ রক্ষা ও গ্রামীণ জীবিকার উন্নয়নে অবদান রাখার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশুদ্ধ পানি ও পরিবেশ সংরক্ষণ
নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় ঢাকার দাশেরকান্দি এলাকায় ‘কমল পানি’ প্রকল্প চালু করে জেডআরএফ। ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ১২০টি পরিবার বিশুদ্ধ পানির সুবিধা পাচ্ছে। একই এলাকায় আরও প্রায় ১৬০টি পরিবার ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির সুবিধা গ্রহণ করছে।
পরিবেশ সংরক্ষণেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং পলিথিন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য পরিবেশদূষণ কমানো, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব আচরণে মানুষকে উৎসাহিত করা।
দুর্যোগ ও সংকটে মানবিক সহায়তা
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি ও অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় জেডআরএফ বিভিন্ন সময়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ২০২৪ সালে ফেনীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং আহত মানুষের সহায়তা ছিল উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর অংশ।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগের কথা ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বিবরণে তুলে ধরা হয়েছে। মাদ্রাসা ও এতিমখানায় স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ এবং ঈদ উপহার বিতরণের মতো কর্মসূচিও পরিচালিত হয়েছে।
দেশের বাইরেও মানবিক সহায়তার উদ্যোগে অংশ নিয়েছে ফাউন্ডেশন। তুরস্কের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় জেডআরএফের সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি দল ঢাকায় তুরস্ক দূতাবাসে কম্বল হস্তান্তর করে।
মানবিক দর্শন ও ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার
জেডআরএফের প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান তাঁর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতে মানুষের কল্যাণ, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, কৃষি, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান তাঁর বাণীতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তায় ফাউন্ডেশনের উদ্যোগগুলো তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ছোট ছোট উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজীজ সুমনের মূল্যায়নেও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাবৃত্তি, কৃষি সহায়তা, পুনর্বাসন ও তরুণদের উদ্ভাবনী কার্যক্রমের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
২৭ বছরের পথচলায় জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের বিস্তৃতি স্বাস্থ্যসেবা থেকে শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ ও দুর্যোগ মোকাবিলা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা, সেবার মান বাড়ানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির সামনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মানবিক সেবা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে ফাউন্ডেশনের এই যাত্রা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
































