ঘাঁটি রক্ষায় মরিয়ে জাতীয় পার্টি, বিএনপি-জামায়াত, লড়াইয়ের আভাস
Published : ২০:৩৮, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনে ২৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একসময় জাতীয় পার্টির ঘাঁটিখ্যাত এ বিভাগে এবার তাদের অবস্থান অনেকটাই দুর্বল বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।
বেশির ভাগ আসনে এবার বিএনপি-জামায়াত দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছে এলাকার মানুষ। তবে কোথাও কোথাও কিছুটা হলেও জাতীয় পার্টি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
জাতীয় পার্টি নিজেদের ঘাঁটি বা দুর্গ রক্ষা করতে বিএনপি-জামায়াতের লড়াইয়ের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মাঠে নেমেছেন। জাতীয় পার্টি নিজেদের ঘাঁটি রক্ষায় মরিয়ে হয়ে উঠলেও রংপুর বিভাগের বেশির ভাগ আসনে বিএনপি-জামায়াতের লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
রংপুরের চিত্র:
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রংপুর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া), রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) ও রংপুর-৬(পীরগঞ্জ) আসনে দ্বিমুখী লড়াই হতে পারে। জেলার কিছু আসনে জাপা ও এনসিপির উপস্থিতি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ত্রিমুখী করছে। রংপুর-৩ আসনে ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা জাপাও এবার বিএনপি ও জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারে।
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি কর্পোরেশনের ১-৯নং ওয়ার্ড) আসনে জাপা প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় এখন আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থী দলের জেলা কমিটির সদস্য মোকাররম হোসেন সুজন ও জামায়াতের প্রার্থী দলের মহানগর কমিটির সেক্রেটারি রায়হান সিরাজী এখন মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ টি এম আজহারুল ইসলামের বিপরীতে জাতীয় পার্টির আনিছুল ইসলাম মন্ডল ও বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকারও লড়াইয়ে রয়েছেন বলে মত ভোটারদের। জাপা ও বিএনপির প্রার্থীরা এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন।
রংপুর-৩ (সদর ও সিটি কর্পোরেশনের ১০-৩৩ নং ওয়ার্ড) আসন দীর্ঘদিন ধরে জাপার দখলে ছিল। এবার জাপা বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে দলটির ওপর চাপ বেড়েছে। তবে এ আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জাপা নেতারা। এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
তিনি জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ভাই। তবে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল, বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আমিরুজ্জামান পিয়ালও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছুড়ে দিতে চান।
রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী শিল্পপতি এমদাদুল হক ভরসা। তবে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির আখতার হোসেন শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন। জাপার প্রার্থী আবু নাসের মো. মাহবুবার রহমানও অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসন দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতপন্থী ভোটারের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে জামায়াতের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এবং বিএনপির অধ্যাপক গোলাম রব্বানী দুই প্রার্থীর নাম এক হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আলাদা আলোচনাও রয়েছে। জামায়াতের প্রার্থী গোলাম রব্বানী বলেন, এ আসনে আমাদের যথেষ্ট ভোটব্যাংক আছে।
আমরা জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। সব ধর্মবর্ণের মানুষের সাড়া পাচ্ছি। বিএনপির প্রার্থী গোলাম রব্বানী বলেন, মানুষ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। ১২ তারিখ জয়ের মালা মিঠাপুকুরবাসীকে উপহার দেব। নির্বাচিত হলে আমি হব মিঠাপুকুরবাসীর পাহারাদার।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে এর আগে মূলত আওয়ামী লীগ ও জাপার প্রভাবই বেশি দেখা গেছে। তবে এবার পরিস্থিতি বদলেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছে, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বিএনপির সাইফুল ইসলাম এবং জামায়াতের মাওলানা নুরুল আমিনের মধ্যে।
পঞ্চগড়ের চিত্র:
পঞ্চগড়-১ (তেঁতুলিয়া, সদর, আটোয়ারী) আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির।
তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সারজিস আলম বলেন, জনগণের কাছে প্রার্থীর ক্লিন ইমেজ থাকা উচিত। তাছাড়াও মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
পঞ্চগড়-২ (দেবীগঞ্জ ও বোদা) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির পল্লি উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন আজাদ ও জামায়াতে ইসলামীর মো. সফিউল আলমের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা করছেন ভোটাররা।
ঠাকুরগাঁওয়ের চিত্র:
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই আসনে বড় ফ্যাক্টর সনাতন ধর্মের প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার ভোটার। এই ভোটব্যাংকের সমর্থন যেদিকে যাবে, সেই প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আব্দুল হাকিম এবং বিএনপির প্রার্থী ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ডা. আব্দুস সালাম দুজনেই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
জাপার নুরুন নাহার বেগম ও গণঅধিকার পরিষদের ফারুক হাসানও লড়াইয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জাপার প্রার্থী সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দীন, জামায়াতের মিজানুর রহমান ও বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি জাহিদুর রহমান জাহিদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে মত ভোটারদের।
নীলফামারীর চিত্র:
নীলফামারীতে চারটি আসনে ২৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে একটিতে জামায়াত শক্ত অবস্থানে, একটিতে ত্রিমুখী ও দুটিতে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার আভাস ভোটারদের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নীলফামারী-২ (সদর) আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আপন খালাতো ভাই ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিনের সঙ্গে জামায়াতের আল ফারুক আব্দুল লতিফ এর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
লালমনিরহাটের চিত্র:
লালমনিরহাটের তিনটি আসনের একটিতে বিএনপি শক্ত অবস্থানে থাকলেও বাকি দুটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। এর মধ্যে লালমনিরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু শক্ত অবস্থানে আছেন। তবে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবু তাহের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চান।
গাইবান্ধার চিত্র:
গাইবান্ধার আট উপজেলার ৫টি সংসদীয় আসনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্রসহ মোট ৪৫ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পাঁচটি আসনের দুটিতে জামায়াত এবং একটিতে বিএনপি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়াএকটিতে জামায়াত-বিএনপি এবং অন্যটিতে জাপার সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা ভোটারদের।
এর মধ্যে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে বিএনপির জিয়াউল ইসলাম, জামায়াতের মাজেদুর রহমান এবং জাপার মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী লড়াইয়ে আছেন।
কুড়িগ্রামের চিত্র:
কুড়িগ্রাম জেলার চারটি আসনের মধ্যে কুড়িগ্রাম-১-আসনে জামায়াত-জাপা-বিএনপির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে মত ভোটারদের। কুড়িগ্রাম-২ আসনে জামায়াত-বিএনপি, কুড়িগ্রাম-৩-আসনে বিএনপি-জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনের লড়াই হবে। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী আপন দুই ভাইয়ের মধ্যে লড়াই হবে এমনটাই বলছেন ভোটাররা।
দিনাজপুরের চিত্র:
দিনাজপুর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে একটিতে জামায়াতের প্রার্থী শক্ত অবস্থানে আছেন। চারটিতে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবং একটিকে বিএনপি ও স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রার্থীর মধ্যে লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন ভোটারগণ।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার ভোটারদের সাথে কথা বলে দ্বিমুখী ও ত্রিমুখী যে ধরণের লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাউক না তার প্রকৃত চিত্র জানা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটাদের ভোটাধিক প্রয়োগের ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে। সেই পর্যন্ত অবশ্যই আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
বিডি/এএন



























