গাজা যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে: ফিল গর্ডন

গাজা যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে: ফিল গর্ডন ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Published : ১৩:১৪, ১২ অক্টোবর ২০২৬

গাজা যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফিল গর্ডন। তিনি সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

রোববার (১১ অক্টোবর) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে গর্ডন বলেন, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন জনসাধারণের সমর্থনে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন শুধু বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মার্কিন সমাজের নতুন প্রজন্মের মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে।

ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপের দাবি বাড়ছে
গর্ডনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টিতে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপের পক্ষে সমর্থন বেড়েছে। একসময় এ ধরনের অবস্থানকে দলের প্রান্তিক মত হিসেবে দেখা হলেও এখন তা মূলধারার আলোচনায় উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে মার্কিন জনমতের পরিবর্তন দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেই দেখা যাচ্ছে, যদিও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা বেশি স্পষ্ট।

গর্ডনের মতে, ভবিষ্যতে ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠিত হলে এবং নীতিগত পরিবর্তন এলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত হতে পারে। তবে আস্থা পুনর্গঠনে উভয় পক্ষকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা চালাতে হবে। 

যুদ্ধবিরতি আলোচনায় নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সাক্ষাৎকারে গর্ডন ২০২৪ সালের গাজা যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির আলোচনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ মে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে বহুধাপের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রকাশ করেছিলেন, সেটি নিয়ে কয়েক সপ্তাহের অচলাবস্থার পর হামাস জুলাইয়ের শুরুতে নীতিগতভাবে সম্মতি জানায়।

এরপর ৪ জুলাই বাইডেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করে চুক্তির বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। গর্ডনের দাবি, ওই আলোচনায় নেতানিয়াহু নতুন কিছু শর্তের কথা তোলেন, যা চুক্তি নিয়ে অগ্রগতিকে কঠিন করে তোলে।

এসব শর্তের মধ্যে ছিল মিসর-গাজা সীমান্তের ফিলাডেলফি করিডোরে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি বজায় রাখা এবং উত্তর গাজায় ফিরে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের তল্লাশির ব্যবস্থা। গর্ডন বলেন, তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইওভ গ্যালান্টসহ কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা করিডোরে সেনা রাখার সামরিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্ত দিতে অস্বীকৃতি জানান গর্ডন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মনে করতেন সামরিক লক্ষ্য অর্জনে এসব শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব অবস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা
গর্ডন বাইডেন প্রশাসনের নীতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখার পাশাপাশি যুদ্ধ পরিচালনা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ ছিল ওয়াশিংটনের সামনে।

তিনি বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সব ধরনের সামরিক সহায়তা বন্ধ করা এবং কোনো শর্ত ছাড়াই সহায়তা অব্যাহত রাখার মাঝখানে আরও অনেক নীতিগত বিকল্প ছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গর্ডন। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর মার্চে তা ভেঙে গেলে এবং গাজায় খাদ্য, পানি ও ওষুধের সরবরাহে গুরুতর বাধা তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।

গর্ডনের মতে, যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির চুক্তিতে পৌঁছানো ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও গাজার মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে আরও আগে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

ইরান নিয়ে সংঘাতের ঝুঁকি
সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা নিয়েও সতর্ক করেন গর্ডন। তাঁর মতে, উভয় পক্ষই মনে করছে সময় তাদের অনুকূলে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ ইরানকে দুর্বল করছে; অন্যদিকে ইরান মনে করতে পারে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে ওয়াশিংটনের পক্ষে দীর্ঘদিন সংঘাত চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

গর্ডন বলেন, এই পরিস্থিতি একটি অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক অচলাবস্থা তৈরি করেছে। উত্তেজনা আরও বাড়লে পুরো অঞ্চলে নতুন সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সাক্ষাৎকারে তাঁর মূল সতর্কবার্তা ছিল, গাজা যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ মানবিক প্রভাব ফেলেনি; যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক অবস্থানকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তাঁর মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব হলেও এর চ্যালেঞ্জকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট

শেয়ার করুনঃ
Advertisement