আগামীতে যে সরকার নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব নেবে, তাদের জন্য একটি সুসংহত ও বাস্তবভিত্তিক সাত দফা ‘পরিবেশ অ্যাজেন্ডা’ উপস্থাপন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মূল সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানের ভিত্তি তৈরি করছে।
এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ও কার্যকর বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পরিবেশগত সমস্যার পাহাড় খুব অল্প সময়ের মধ্যে সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, চীন যে ধরনের পরিবেশ সংকট এক দশকে সমাধান করতে পারেনি, তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেড় বছরের মধ্যে প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে বাস্তবতার কথা স্বীকার করলেও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা।
নির্বাচনি ইশতেহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ভালো ও আকর্ষণীয় বক্তব্যের অভাব নেই। কিন্তু বড় ঘাটতি রয়েছে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপে।
কেবল প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, সেই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবে রূপ নেবে—তা পরিষ্কার না হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল পায় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গত চারটি জাতীয় নির্বাচনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
বুড়িগঙ্গা নদীর বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, নদীর তলদেশে কোথাও কোথাও ৫ থেকে ৭ মিটার পুরু পলিথিনের স্তর জমে আছে।
তিনি জানান, সাভার এলাকাকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড ঘোষণা করা হয়েছে এবং অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পলিথিনমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জনগণকেও নিজ নিজ আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশবান্ধব যেকোনো উদ্যোগে সরকার সহযোগিতা করবে। তবে পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে পরিবেশগত ভিত্তি নির্মাণ করছে, আগামী সরকার সেটিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং পরিবেশকে উন্নয়নের প্রান্তিক বিষয় হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিগত অ্যাজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
আগামী সরকারের জন্য প্রস্তাবিত তার সাত দফা পরিবেশ অ্যাজেন্ডা তুলে ধরে তিনি বলেন—
প্রথমত, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং যানবাহনের জ্বালানির মান ইউরো-৪ থেকে উন্নীত করে ইউরো-৬ এ নিতে হবে, যাতে সামগ্রিকভাবে বায়ুমান উন্নত হয়।
দ্বিতীয়ত, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা কার্যকর করে পুলিশ সার্জেন্টদের সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা দিতে হবে এবং নির্বিচারে হর্ন ব্যবহারের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
তৃতীয়ত, বন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করতে হবে এবং বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রাকৃতিক বন অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের পথ বন্ধ রাখতে হবে।
চতুর্থত, বন্যপ্রাণী কল্যাণ নিশ্চিত করতে বন্যপ্রাণী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
পঞ্চমত, শিল্প দূষণ রোধে অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ষষ্ঠত, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজসহ বড় প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
সপ্তমত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিভাগীয় শহরগুলোতে উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে সার উৎপাদনের মতো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।


































