জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে এক ধরনের টানাপড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বর্তমান সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নানা সময়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে গণভোটও।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে ভারত। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ঢাকায় ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। সেখানে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
প্রণয় ভার্মা বলেন, ভারত সব সময় একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে ছিল এবং ভবিষ্যতেও সেই সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দুই দেশের যৌথ ত্যাগ ও অভিন্ন ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এক বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার প্রতি দুই দেশের মানুষের অভিন্ন ভালোবাসা এই সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বদের সৃষ্টিকর্ম থেকে শুরু করে নৃত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এক গভীর সাংস্কৃতিক সান্নিধ্য গড়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংযুক্তি ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা দ্রুত রূপান্তরিত হয়েছে, যার ফলে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও নির্ভরশীলতা বেড়েছে। এর সুফল সমাজ, জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরস্পরের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতার উদাহরণ টেনে প্রণয় ভার্মা বলেন, ভারতীয় শোধনাগার থেকে বাংলাদেশে উচ্চগতির ডিজেল পরিবহনের আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন এবং ভারত ও নেপাল থেকে ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের আন্তঃসীমান্ত সঞ্চালন লাইন—এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে দুই দেশ একসঙ্গে জ্বালানি সংযুক্তির শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে, যা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, পারস্পরিক সরবরাহ শৃঙ্খল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতকে শক্তিশালী করেছে। এসব উদাহরণ স্পষ্ট করে যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা দুই দেশের জনগণ ও ব্যবসার জন্য বাস্তব সুফল বয়ে এনেছে।
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, এসব সাফল্য ভবিষ্যতের জন্য আরও দূরদর্শী ও প্রস্তুত সহযোগিতার পথ খুঁজে নিতে অনুপ্রেরণা জোগায়। এই সহযোগিতা হবে সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও অংশীদারিত্বের যৌথ আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অংশীদারিত্ব বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি দ্বারা চালিত এবং পারস্পরিক স্বার্থ, সুবিধা ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে লালিত। এমন অংশীদারিত্বই টেকসইভাবে দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব।
প্রণয় ভার্মা বলেন, তরুণ, দক্ষ ও উদ্ভাবনী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে দ্রুত বর্ধনশীল দুটি অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের টেকসই প্রবৃদ্ধির অনুঘটক হতে পারে। পাশাপাশি একে অপরের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির সহায়ক শক্তি এবং দৃঢ় আঞ্চলিক সংহতির ভিত্তি হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম।
তিনি আরও বলেন, একসঙ্গে কাজ করে দুই দেশ আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল, যৌথ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ও জ্বালানি করিডোর গড়ে তুলতে পারে, যা উভয় অর্থনীতির উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে জ্বালানির ভবিষ্যৎকে পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করার ক্ষেত্রেও যৌথ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিন্ন বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ভৌগোলিক নৈকট্যকে নতুন সুযোগে রূপান্তরিত করে দুই দেশ নিজেদের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের জন্যও ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রণয় ভার্মা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের মূল্য পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য ভবিষ্যৎ যাত্রায় শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও বক্তব্য রাখেন।


































