পাঁচ লাখ টাকার যাত্রা, এখন মাসে ৮ কোটি টাকা বেতন

পাঁচ লাখ টাকার যাত্রা, এখন মাসে ৮ কোটি টাকা বেতন ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০২:৩৪, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

২০১৭ সালে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা পুঁজি ও সাতজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিডিকলিং আইটি আজ এক বিস্ময়কর রূপান্তরের উদাহরণ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিধি কয়েক গুণ বেড়ে এখন গড়ে উঠেছে ২২টি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত বিটোপিয়া গ্রুপ। বর্তমানে এই গ্রুপে কর্মরত আছেন প্রায় চার হাজার মানুষ। যে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিল সামান্য মূলধন নিয়ে, সেটিই এখন প্রতি মাসে শুধু কর্মীদের বেতন দিচ্ছে প্রায় আট কোটি টাকা।

বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন শূন্য থেকে শুরু করে এই গ্রুপকে দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা হয় ২০১৩ সালে, যখন তিনি ওডেস্ক ও ইল্যান্সের মতো আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে একা কাজ করতেন। কাজের চাপ বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে দল গঠন করেন এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় বিডিকলিং আইটি।

শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ তৈরি, ভিজ্যুয়াল ও ক্রিয়েটিভ ডিজাইন, ডেটা এন্ট্রি এবং ডিজিটাল মার্কেটিংসহ নানা সেবায় যুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিটোপিয়া গ্রুপের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে তাদের সেবার তালিকায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড সলিউশন ও ডেটা সেন্টার সেবা। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি।

ফিনটেক, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন শিল্পভিত্তিক খাতে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি সমাধান দিচ্ছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, ব্রাজিল ও ফিলিপাইনসহ বিশ্বের ৭৮টি দেশে বিটোপিয়া গ্রুপের কার্যক্রম বিস্তৃত হলেও মোট কাজের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক।

দুই বছর আগেও, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিডিকলিং আইটিতে কর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০০ জন এবং মাসিক আয় ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা। গত দুই বছরে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এ সময়ে কর্মী সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯০০ শতাংশ এবং আয় বেড়ে হয়েছে প্রায় সাত গুণ। বর্তমানে বিটোপিয়া গ্রুপের বার্ষিক সম্মিলিত আয় প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

এ পর্যন্ত গ্রুপটিতে মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিন কোটি টাকা ব্যাংকঋণ এবং বাকি ৪২ কোটি টাকা নিজস্ব বিনিয়োগ। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে রাজস্ব হিসেবে দিয়েছে ২৫ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে কর্মীদের অবদানকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন সিইও মনির হোসেন। তাঁর ভাষায়, কর্মীদের আন্তরিকতা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতাই এই অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেন, তাঁর স্বপ্ন দেশের মানুষের জন্য কাজ করা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা—যা কর্মীরাও বাস্তবায়নে বিশ্বাস করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো বিটোপিয়া গ্রুপের অন্যতম অগ্রাধিকার। দেশের প্রথম দিককার উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে তারা এআই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ শুরু করেছে, যেখানে উচ্চক্ষমতার জিপিইউ অবকাঠামো থাকবে। এতে এআই ও মেশিন লার্নিং অ্যাপ্লিকেশন পরিচালনা সহজ হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণ করছে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানির পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

মনির হোসেন জানান, নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ডেটা সেন্টার গড়ে তোলায় কম খরচে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারের আকার যেখানে কয়েকশ কোটি ডলার, সেখানে এআই ও ক্লাউড সেবার বাজার দ্রুত ট্রিলিয়ন ডলারের দিকে এগোচ্ছে। এই খাতে দক্ষ জনবল, আধুনিক ডেটা সেন্টার ও প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার থাকলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। এজন্য এআই–সংক্রান্ত হার্ডওয়্যার আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। মনির হোসেনের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি ও এআই খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের উচ্চ খরচ এবং সীমিত প্রাপ্যতা। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবও বড় বাধা। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে প্রযুক্তি ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও হাইটেক অবকাঠামোর ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং দুর্বলতাও বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, গত দেড় দশকে ফ্রিল্যান্সিং খাতে অনেক অগ্রগতি হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি শক্তিশালী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করে দেশে স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement