দুর্ভোগে দ্বীপবাসী, ক্লিনিক নেই, চিকিৎসক নেই

দুর্ভোগে দ্বীপবাসী, ক্লিনিক নেই, চিকিৎসক নেই ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৬:৪২, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মুজিবনগরে বসবাসকারী হাজারো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

দ্বীপটির ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার কারণে দ্বীপবাসীর দুর্ভোগ দিন দিন বেড়ে চলেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুজিবনগর দ্বীপে কোনো ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। সাধারণ ওষুধও সরবরাহ করা হয় না। ফলে সাধারণ রোগে আক্রান্ত হলে মানুষকে নির্ভর করতে হয় স্থানীয় ঝাড়ফুঁক বা অনভিজ্ঞ চিকিৎসার ওপর। দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে নদীর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে নৌকাই একমাত্র ভরসা।

কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর স্রোত ও নৌযানের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতের সময় কেউ অসুস্থ হলে নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। এতে করে জরুরি রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে জীবনঝুঁকিতে পড়ছেন। নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের অভাবও এই দুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

দ্বীপবাসীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব বা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই। অনেকে ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, মুজিবনগর ইউনিয়নের আয়তন ৮.৭৭ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, বারবার জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সমস্যার কথা জানিয়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলেও দ্বীপবাসী তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “অসুস্থ হলে আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া আর কোনো উপায় পাই না।”

স্থানীয় ফজল মাঝি বলেন, “প্রায় ৪০ বছর ধরে আমরা মুজিবনগরে বসবাস করছি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একটি ক্লিনিকও সরকার স্থাপন করেনি। মূল ভূখণ্ডে যেতে আমাদের নদী পার হতে হয় এবং নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। আমরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনছি। কারণ কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব নয়।”

বিবি কলছুম জানান, “২০২৪ সালে হঠাৎ আমার প্রসব বেদনা শুরু হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে যায়, কিন্তু গভীর রাত হওয়ায় পরিবারের লোকজন আমাকে মূল ভূখণ্ডে নিতে পারেনি। তখন একজন ধাত্রী মহিলার সাহায্যে ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করেছি।”

দ্বীপবাসী আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং মুজিবনগরের মানুষও অন্য এলাকার মতো মৌলিক চিকিৎসা সেবা পাবে। তারা আশঙ্কা করছেন, তা না হলে স্বাস্থ্য-ঝুঁকি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

মুজিবনগর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মনির হাওলাদার বলেন, “দ্বীপটিতে দ্রুত একজন স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করার দাবি রাখছি।”

চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, “দেশের নাগরিক হিসেবে মুজিবনগর দ্বীপের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। আমি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অবগত করব।”

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement