রংপুরে আলু ক্ষেতে লেট ব্লাইট আক্রমণে চরম উদ্বেগ্ন কৃষক

রংপুরে আলু ক্ষেতে লেট ব্লাইট আক্রমণে চরম উদ্বেগ্ন কৃষক ছবি: সংগৃহীত

রংপুর প্রতিনিধি

Published : ২০:৫০, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৫০ হেক্টর বেশি জমিতে আলু চাষ হয়েছে। আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লক্ষ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমি। আলু চাষ হয়েছে ১ লক্ষ ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে।

লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে বেশি জমিতে আলু চাষ হলেও আলু ক্ষেতে লেট ব্লাইট বা আলুর পাতামড়ক রোগ ছড়িয়ে পড়ায় চরম উদ্বেগ্ন হয়ে পড়েছে আলু চাষিরা।

উত্তরাঞ্চলে টানা কয়েক দিন দলে ঘনকুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে আলু ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে লেট ব্লাইট বা আলুর পাতামড়ক রোগ। আলু চাষিদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত আলু গাছের পাতায় কালচে দাগ ও ফোসকার মতো ক্ষত তৈরি হচ্ছে। ধীরে ধীরে পাতা শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়কে আলুর মড়ক রোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ধরা হয়।

নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা আবহাওয়া এবং গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে লেট ব্লাইট রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের নয়নখাল গ্রামে আবুল কাশেম নামে এক কৃষক বলেন, ক্ষেতে আলুর চারা যখন সতেজ হয়ে সবুজ হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের প্রভাবে লেট ব্লাইট বা পাতামড়ক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

আক্রান্ত আলু ক্ষেতে ছত্রাকনাশক ¯েপ্র করেও রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আমজাদ হোসেন বলেন, গত ৪ ডিসেম্বর স্টিক জাতের আলু রোপণ করেছেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ছত্রাকনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এবার আবহাওয়ার প্রভাবে লেট ব্লাইটের পরিমাণ বেশি দেখা যাচ্ছে। ইউরিয়া সার ব্যবহারের কারণেও রোগটি আরও বিস্তার লাভ করেছে।

গত বছর আলু চাষে যে ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সামনে ফলন কমে গেলে আবারও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ফলগাছা গ্রামের রফিকুল ইসলাম আলু ক্ষেতে উঠতি গাছগুলোর পাতার নিচে কালচে রং ধরেছে।

ঘনকুয়াশা ও শীতের তীব্রতায় আলু ক্ষেত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে কৃষক। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার পাকেরহাট এলাকার আলু চাষি আব্দুল গফুর বলেন, গত বছর আলু চাষে ক্ষতি হয়েছে। চলতি বছর অল্প জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। প্রচন্ড শীতের সকালে আলু ক্ষেতে গিয়ে পোকা ধরা গাছ দেখলে মন ভেঙে যায়।

এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে এবারও আলুতে ক্ষতি হবে। অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং থেকে এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, শীত মৌসুমে লেট ব্লাইট রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। এমন অবস্থায় ফসল সুরক্ষায় কৃষকদের আগাম করণীয় ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় আলুর মড়ক রোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা আবহাওয়া ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে ১ লক্ষ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রংপুর জেলায় ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১২ হাজার ৫০ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৭ হাজার ১০০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর ও নীলফামারীতে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৫০ হেক্টর বেশি জমিতে  আলু চাষ হয়েছে।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ আলুর মড়ক রোগ প্রতিরোধে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে খোঁজখবর রাখছেন। রোদ কম থাকলে আলুর পাতা গজানোর পর থেকে ৫ দিন পরপর ৪০ দিন পর্যন্ত ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক  স্প্রে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আলুর ব্লাইট বা মড়ক রোগের লক্ষণ সম্পর্কে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রথমে গাছের গোড়ার দিকের পাতায় ছোপ ছোপ ভেজা, হালকা সবুজ গোলাকার বা বিভিন্ন আকারের দাগ দেখা যায়। পরে এসব দাগ দ্রুত কালো রং ধারণ করে এবং পাতা পচে যায়। সকালে মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু দেখা যায়।

রোগের অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাত দিন পরপর অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে  স্প্রে করতে হবে ও গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। যদি ফসল ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে জমিতে সেচ বন্ধ করে ৪ থেকে ৫ দিন পরপর সঠিক মাত্রায় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক  স্প্রে করতে হবে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement