প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত হবে।
এই হাসপাতাল বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, রংপুর ও ঢাকা-কেন্দ্রিক বড় হাসপাতালগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরে যে অতিরিক্ত চাপ রয়েছে, তা কমাতে হলে স্বাস্থ্যসেবার কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। নীলফামারীতে প্রস্তাবিত এই হাসপাতাল সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা পালন করবে এবং আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সভায় আলোচনার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু বাংলাদেশের রোগীরাই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্যসেবায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। নেপাল ও ভূটানসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর রোগীরাও এখানে উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এর ফলে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত একটি শক্তিশালী চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত হবে।
একনেক সভায় প্রকল্প অনুমোদনের প্রেক্ষাপটে তিনি আরও বলেন, এই হাসপাতাল কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; বরং এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষ নিজ নিজ এলাকায় থেকেই উন্নত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারবে, যা তাদের সময়, ব্যয় ও ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে প্রকল্পটি জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ সময়কালে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৪৫৯.৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন থাকবে ১৭৯.২৭ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট অংশ চীনা অনুদান সহায়তা থেকে আসবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের মার্চ মাসে চীন সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে একটি উন্নত ও আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের কাছে অনুরোধ জানান। তারই প্রেক্ষিতে চীন সরকার দ্রুততার সঙ্গে এই হাসপাতাল নির্মাণ উদ্যোগ গ্রহণ করে।
প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী সদর উপজেলায় একটি আধুনিক ১০ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডরমেটরি ও আবাসিক ভবন, ডিরেক্টরস বাংলো, প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।
এই হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি, নিউরোলজি প্রভৃতি বিশেষায়িত বিভাগ চালু করা হবে। আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং আধুনিক অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব খাতে প্রায় ৮৯৩ জন চিকিৎসক, ১,১৯৭ জন নার্স এবং ১,৪১০ জন অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে এবং স্বাস্থ্যখাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে, দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ভোগান্তি হ্রাস পাবে এবং সময়মতো জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় একটি ১০ তলা নতুন হাসপাতাল ভবন, একটি ১০ তলা অধ্যাপক ও সিনিয়র ডক্টর কোয়ার্টার ভবন, একটি ১০ তলা ডক্টরস ডরমেটরি ভবন, একটি ২ তলা বিশিষ্ট ডুপ্লেক্স ডিরেক্টরস বাংলো, দুটি ৬ তলা বিশিষ্ট নার্স ডরমেটরি ভবন এবং দুটি ১০ তলা বিশিষ্ট কর্মচারী (২য় ও ৩য় শ্রেণি) কোয়ার্টার ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে।
নীলফামারী জেলায় প্রায় ২১ লাখ মানুষের বসবাস, যার একটি বড় অংশ গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী এই জনসংখ্যার জন্য আনুমানিক ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ শয্যার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে জেলা পর্যায়ে কার্যকর শয্যার সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল।
বিদ্যমান স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শয্যা সংখ্যা, বিশেষায়িত বিভাগ এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতির কারণে গুরুতর রোগীদের রংপুর বা ঢাকায় যেতে বাধ্য হতে হয়, যা সময়, ব্যয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, মাতৃ ও নবজাতক জটিলতা এবং সংক্রামক রোগের চাপ। এসব রোগের জন্য প্রয়োজন উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সার্জারি এবং ইনটেনসিভ কেয়ার সুবিধা। কিন্তু এসব সুযোগ সীমিত থাকায় জেলার একটি বড় অংশের জনগণ সময়মতো প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত ও জরুরি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমানে নীলফামারী জেলায় স্বাস্থ্যসেবা মূলত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানে আইসিইউ, এইচডিইউ, ডায়ালাইসিস, পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার ইউনিট, নিউরো ইমার্জেন্সি, কার্ডিয়াক কেয়ার, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি এবং বিশেষায়িত মাতৃ ও নবজাতক সেবার সক্ষমতা সীমিত। ফলে জটিল ও গুরুতর রোগে আক্রান্ত রোগীদের বাধ্য হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করতে হয়।































