ইউরোপজুড়ে ১ লাখের বেশি অভিবাসীর বিরুদ্ধে ইইউ ছাড়ার আদেশ

ইউরোপজুড়ে ১ লাখের বেশি অভিবাসীর বিরুদ্ধে ইইউ ছাড়ার আদেশ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ২১:৫৫, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্র থেকে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে মোট এক লাখ ১৫ হাজার ৪৪০ জন অভিবাসীকে সংশ্লিষ্ট দেশ ত্যাগ করার আইনি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইইউভুক্ত দেশগুলোতে অনিয়মিতভাবে অবস্থান করার কারণে এসব অভিবাসীর বিরুদ্ধে ‘দেশ ছাড়ার বাধ্যবাধকতা’ বা রিটার্ন অর্ডার জারি করা হয়েছে।

জাতীয়তা অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আদেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন আলজেরিয়ার নাগরিকরা। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে মোট ১২ হাজার ৩২৫ জন আলজেরীয় নাগরিককে তারা যে দেশে অবস্থান করছিলেন, সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা মোট আদেশের প্রায় ১০ শতাংশ। এর পরেই রয়েছেন মরক্কোর নাগরিকরা (৬ হাজার ৬৭০ জন) এবং তুরস্কের নাগরিকরা (৬ হাজার ৩৫০ জন)।

দেশভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ইইউর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশ ছাড়ার আদেশ জারি করেছে ফ্রান্স। উক্ত সময়কালে দেশটি ৩৩ হাজার ৭৬০ জনের বিরুদ্ধে এই আদেশ দিয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি, যেখানে ১২ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে আদেশ জারি হয়েছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে গ্রিস, সেখানে এই সংখ্যা ১০ হাজার ১০০।

ইউরোস্ট্যাট জানায়, এই তিনটি দেশ মিলেই ইইউজুড়ে জারি করা মোট দেশ ছাড়ার আদেশের প্রায় ৪৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে যাদের বিরুদ্ধে দেশ ছাড়ার নির্দেশ জারি হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৩৪ হাজার অভিবাসী বাস্তবে নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। এই প্রত্যাবর্তনকারীদের মধ্যে ১৩ হাজার ৫১০ জনকে পুলিশি প্রহরায় জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অন্যরা স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজ দেশে ফিরে গেছেন। সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রত্যাবাসনের প্রায় ৬০ শতাংশ স্বেচ্ছায় এবং বাকি ৪০ শতাংশ জোরপূর্বক হয়ে থাকে।

প্রত্যাবাসন কার্যকর করার ক্ষেত্রে জার্মানি সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে জার্মানি থেকে মোট ৭ হাজার ১৯০ জন অনিয়মিত অভিবাসী নিজ দেশে ফিরে গেছেন। একই সময়ে ফ্রান্স থেকে ৩ হাজার ৭৬০ জন এবং সাইপ্রাস থেকে ৩ হাজার অভিবাসী প্রত্যাবর্তন করেছেন। এসব পরিসংখ্যানে স্বেচ্ছা ও জোরপূর্বক—উভয় ধরনের প্রত্যাবাসন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

শুধু জোরপূর্বক বহিষ্কারের হিসাব বিবেচনায় নিলেও শীর্ষে রয়েছে জার্মানি। ওই সময়ে দেশটি ৩ হাজার ৭১০ জনকে জোরপূর্বক নিজ দেশে পাঠিয়েছে। এরপর রয়েছে ফ্রান্স (১ হাজার ৪৩৫ জন) এবং ইতালি (১ হাজার ১০০ জন)।

জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের হার সবচেয়ে বেশি ইতালিতে। দেশটিতে প্রত্যাবর্তনের সব ঘটনাই ছিল জোরপূর্বক, সেখানে কোনো স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন হয়নি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক, যেখানে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের হার ৯১ শতাংশ। ফ্রান্সে এই হার তুলনামূলকভাবে কম—সেখানে ৩৮ শতাংশ জোরপূর্বক এবং ৬১ শতাংশ স্বেচ্ছায় দেশে ফিরেছেন।

ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, আলজেরীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রত্যাবাসনের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে পুরো ইইউজুড়ে মাত্র ৩৫০ জন আলজেরীয় নাগরিককে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, আলজেরিয়া খুব কম ক্ষেত্রেই কনস্যুলার পাস ইস্যু করে। পাসপোর্টবিহীন অভিবাসীদের বহিষ্কারের জন্য এই কনস্যুলার পাস একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি।

ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আলজেরিয়া অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের কনস্যুলার নথি দিতে বিলম্ব করে বা প্রত্যাখ্যান করে। ফ্রান্সে বিদেশে বসবাসরত সবচেয়ে বড় আলজেরীয় কমিউনিটি রয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অনিয়মিত অবস্থায় বসবাস করে।

এ ছাড়া আলজেরিয়ার আইনে অবৈধভাবে দেশত্যাগকারীদের শাস্তির বিধান থাকায় অনেক আলজেরীয় নাগরিক স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে আগ্রহী নন।

তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। গত ১১ জানুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুন ঘোষণা দেন, বিদেশে অবস্থানরত ‘অনিয়মিত ও অনিশ্চিত’ অবস্থায় থাকা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের জন্য দায়মুক্তির লক্ষ্যে একটি ডিক্রি জারি করা হবে।

তবে বোর্দো-মোঁতান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও আলজেরিয়া বিশেষজ্ঞ কিন্দা বেন ইয়াহিয়া মনে করেন, এই ঘোষণার বাস্তব প্রভাব নিয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তার মতে, ডিক্রিটির সুনির্দিষ্ট শর্ত, প্রয়োগের ক্ষেত্র এবং বিদ্যমান আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে এর মাধ্যমে আলজেরীয় তরুণদের ব্যাপক প্রত্যাবাসন ঘটবে—এমন সম্ভাবনা কম।

ইউরোস্ট্যাট আরও জানায়, এই পরিসংখ্যান ফ্রান্সের প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রগুলোর (সিআরএ) তথ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেখানে দেখা যায়, দেশ ছাড়ার আদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে আলজেরীয় নাগরিকরাই সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন লা সিমাদে জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ফ্রান্সের আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা অভিবাসীদের বড় অংশই ছিলেন মাগরেব অঞ্চলের নাগরিক। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি ছিলেন আলজেরীয়, এক হাজার ৯০০ জন তিউনিশীয় এবং এক হাজার ৭০০ জন মরক্কোর নাগরিক। অন্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি।

একই সময়ে ওই কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৭০০ জন রোমানীয়, ৪৫০ জন আলবেনীয়, ৩৫০ জন গিনির নাগরিক, ৩০০ জন আফগান এবং ৩০০ জন আইভোরি কোস্টের নাগরিক আটক ছিলেন।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement