মুখে সবার আগে বাংলাদেশ, পরিবারের বেলায় আগে বিদেশে বন্দোবস্ত’: নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী

মুখে সবার আগে বাংলাদেশ, পরিবারের বেলায় আগে বিদেশে বন্দোবস্ত’: নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৭:৩৬, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

‘মুখে সবার আগে বাংলাদেশ, আর নিজেদের পরিবারের বেলায় সবার আগে বিদেশে বন্দোবস্ত’—এমন মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর অভিযোগ, দেশের রাজনীতিতে সাধারণ কর্মীদের ত্যাগের বিপরীতে নেতাদের পরিবারের সদস্যরা নানা সুযোগ-সুবিধা পান, অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী।

পোস্টে তিনি লেখেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশ রক্ষার দায়িত্ব কর্মীদের ওপর থাকলেও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেন নেতারা। কর্মীদের সন্তান মিছিল-সমাবেশে অংশ নিলেও নেতাদের সন্তানেরা বিদেশে ক্যারিয়ার গড়েন। তাঁর ভাষায়, বিপদের ভাগ নিচের দিকে নামে, আর সুবিধার ভাগ যায় ওপরের দিকে।

নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেন, চিফ হুইপের তিন ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, সেখানকার নাগরিক এবং চাকরি করেন। তাঁদের ভবিষ্যতের ব্যবস্থা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দলের জন্য নিজের চাকরি, পড়াশোনা ও সংসার উপেক্ষা করা কর্মীদের সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কে নেবে।

সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি লেখেন, ঢাকা মেডিকেলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নিজেই সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নেন, অথচ সাধারণ মানুষকে দেশের হাসপাতালেই চিকিৎসা খুঁজতে হয়। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া অপরাধ নয় উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, যাঁরা দেশের হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের পরিবারের বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে।

রাজনৈতিক কর্মীদের ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, কোনো কর্মী আহত হলে তাঁর চিকিৎসার খরচ কে বহন করবে, মামলা হলে তাঁর পরিবার কীভাবে চলবে—এসব বিষয়েও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। মাঠের কর্মীরা দলের জন্য ঝুঁকি নিলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাঁদের যথাযথ ভূমিকা থাকে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, নির্বাচনের পর তাঁর যোগ্যতা ও কাজের হিসাবও সামনে আসা উচিত। তাঁর মতে, বাবার পদ সন্তানের যোগ্যতার সনদ হতে পারে না। সাধারণ তরুণদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে হলেও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিচয় কতটা সুবিধা দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ তুলে নাসিরুদ্দীন লেখেন, দেশে থেকে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া, নেতাকর্মীদের সাহস জোগানো এবং কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বের মতো কঠিন সময় পার করার কারণে তিনি সম্মানিত। জীবনের শেষ বছরে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলেও দেশে ফিরে এসেছিলেন এবং বাংলাদেশের মাটিতেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।

মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সংস্কারের অর্থ হলো রাজনৈতিক পরিবারের বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা, মনোনয়নে স্বচ্ছতা এবং সম্পদের হিসাব চাওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার সুবিধা ও বণ্টনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাঁর মতে, সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা বক্তৃতায় নয়, বরং নিজেদের পরিবারের সুবিধা কমাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা প্রস্তুত, তার ওপর নির্ভর করবে।

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, জনগণের কাছে ত্যাগ চাওয়ার পরও ক্ষমতা ও সুযোগ বণ্টনের সময় নিজেদের পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তন কীভাবে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও পারিবারিক স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও জবাবদিহি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পোস্টের শেষাংশে নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতায় সাধারণ পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হাসপাতালের সেবার ঘাটতিতে পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায় এবং রাজনৈতিক সংঘাতে মাঠের কর্মীদের পরিবার বিপদে পড়ে। যাঁদের বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে, তাঁদের সিদ্ধান্তের ব্যর্থতার পুরো মূল্য কেন তাঁদের দিতে হবে, যাঁদের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের অসুস্থতা, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তা সার্বক্ষণিক বাস্তবতা। তাই দেশের দায়িত্ব নিয়ে সুবিধামতো উপস্থিত থাকার রাজনীতি চলতে পারে না। পোস্টে আবারও তিনি মন্তব্য করেন, মুখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বলা হলেও নিজেদের পরিবারের ক্ষেত্রে বিদেশে বন্দোবস্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement