কবিতায় অমর জীবনানন্দ, আজ মৃত্যুবার্ষিকী

কবিতায় অমর জীবনানন্দ, আজ মৃত্যুবার্ষিকী ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১২:২৪, ২২ অক্টোবর ২০২৬

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৫৪ সালের এই দিনে কলকাতার বালিগঞ্জে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে দুর্ঘটনার পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এর আট দিন আগে, ১৪ অক্টোবর বালিগঞ্জে ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন কবি। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তাঁর কণ্ঠ, ঊরু ও পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়।

কলকাতায় শেষজীবন কাটলেও জীবনানন্দ দাশের আদি নিবাস বাংলাদেশের বরিশালে। তাঁর পূর্বপুরুষেরা একসময় ঢাকা জেলার তৎকালীন বিক্রমপুর পরগণার কুমারভোগের গাওপাড়ায় বসবাস করতেন। পদ্মার ভাঙনে গ্রামটি বিলীন হয়ে যায়। ১৮৮৩ সালের দিকে বিক্রমপুর থেকে বরিশালে চলে আসে দাশ পরিবার।

জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও পরবর্তী সময়ে পরিবারটি ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করে। বরিশালের ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনে এ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কবির বাবা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ‘ব্রাহ্মবাদী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশের লেখা ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি—‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে’—এখনো পাঠ্যসূচিতে রয়েছে। কবির ডাকনাম ছিল মিলু।

জীবদ্দশায় অর্থনৈতিক সংকট ছিল জীবনানন্দের নিত্যসঙ্গী। কবিতা লেখার কারণে অধ্যাপনার চাকরিও হারাতে হয়েছিল তাঁকে। জীবিকার সন্ধানে বরিশাল, বাগেরহাট ও কলকাতায় ঘুরেছেন। জীবদ্দশায় ব্যাপক প্রচার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পেলেও মৃত্যুর পর তাঁর সাহিত্যকর্ম নতুন করে আলোচনায় আসে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর কবিতা অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

জীবিত অবস্থায় তাঁর মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। মৃত্যুর পর তাঁর ট্রাঙ্ক ও পাণ্ডুলিপি থেকে বহু অপ্রকাশিত কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস ও ছোটগল্প উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব রচনা পাঠক ও সাহিত্যসমালোচকদের কাছে পরিচিতি পায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ঝরা পালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’ এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘রূপসী বাংলা’।

‘বনলতা সেন’ বাংলা ভাষার বহুলপঠিত ও আবৃত্তিযোগ্য কবিতাগুলোর একটি। কবিতার পাশাপাশি ‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’র মতো উপন্যাস এবং ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধগ্রন্থেও তাঁর আধুনিক চিন্তা ও সাহিত্যদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়।

জীবনানন্দের কবিতায় বাংলার প্রকৃতি, ধানসিঁড়ি নদী ও গ্রামীণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি উঠে এসেছে মানুষের গভীর নিঃসঙ্গতা এবং আধুনিক নগরজীবনের ক্লান্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাংলা কবিতার ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হন তিনি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের কবিদের ওপরও তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

সংবেদনশীলতার কবি হিসেবে পরিচিত জীবনানন্দ প্রতিকূল পরিবেশ, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের মধ্যেও সত্য ও সৌন্দর্যের অনুসন্ধান চালিয়ে গেছেন। ব্যস্ত জীবনের কোলাহলে তাঁর কবিতা পাঠককে যেন নির্জনতার শান্ত পরিসরে নিয়ে যায়, নিজের অন্তর্জগৎকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে সপরিবারে বাংলাদেশ ছেড়ে স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে যান জীবনানন্দ দাশ। যাওয়ার সময় এক একরের বেশি জমির ওপর থাকা তাঁদের বাড়িটি অবিক্রীত ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাড়িটি বিক্রি দেখানো হয়। কবির স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি পুনরুদ্ধারের দাবিতে এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন কবিপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement