সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ: শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে ইসলামের নির্দেশনা

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ: শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে ইসলামের নির্দেশনা ছবি : সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ২৩:১৭, ৮ অক্টোবর ২০২৬

মানুষের নিরাপত্তা শুধু তার জীবনের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত তার উপার্জন, সম্পদ, সম্মান এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, হুমকি দিয়ে সম্পদ কেড়ে নেওয়া কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি—এসব কর্মকাণ্ড ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। ইসলামে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জুলুম এবং মানুষের অধিকার হরণের মতো কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির পদ্ধতি ভিন্ন হলেও উভয়ের মধ্যে ভয় সৃষ্টি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যের অধিকার হরণের মতো বিষয় রয়েছে। সন্ত্রাস মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, আর চাঁদাবাজি মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে। ইসলাম এমন সমাজব্যবস্থাকে সমর্থন করে না, যেখানে শক্তিশালী বা প্রভাবশালী কেউ দুর্বল মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি নিষিদ্ধ
মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় কিংবা সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।

কোরআনে পৃথিবীতে ফ্যাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’

(সুরা কাসাস, আয়াত ৭৭)

সুতরাং আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে এমন কর্মকাণ্ড ইসলামের শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক আদর্শের পরিপন্থী।

অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ
ইসলাম মানুষের সম্পদের অধিকারকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। বৈধ ব্যবসা, শ্রমের বিনিময় কিংবা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পদ অর্জন বৈধ। কিন্তু ভয়ভীতি, হুমকি, প্রভাব, বলপ্রয়োগ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারও কাছ থেকে অর্থ বা সম্পদ নেওয়া অন্যায়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না।’

(সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৮৮)

চাঁদাবাজির মাধ্যমে একজনের সম্পদ তার স্বেচ্ছাসম্মতি ছাড়া ভয় বা চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া হয়। ফলে এটি মানুষের সম্পদের অধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর অন্যায়।

মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা
ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একজন ব্যক্তি অন্যায়ভাবে অন্যের জীবন, সম্পদ কিংবা মর্যাদার ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন ও সম্পদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন—‘তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য হারাম (মর্যাদাপূর্ণ), যেমন তা হারাম (মর্যাদাপূর্ণ) তোমাদের এই দিনে, তোমাদের এই মাসে এবং তোমাদের এই শহরে।’

(মুসলিম, হাদিস ১২১৮)

এই নির্দেশনা মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে।

জুলুমের পরিণতি ভয়াবহ
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জুলুমের সম্পর্ক রয়েছে। ভয় দেখিয়ে মানুষের নিরাপত্তা নষ্ট করা কিংবা হুমকি ও প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়—উভয় ক্ষেত্রেই অন্যের ওপর অন্যায় করা হয়।

ইসলাম জুলুমের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’

(মুসলিম, হাদিস ৬৭৪১)

দুনিয়ায় ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে অন্যায় সুবিধা নেওয়া সম্ভব হলেও ইসলামী শিক্ষায় জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।

অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারীদের ব্যাপারে সতর্কতা
মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কে ইসলাম গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। হাদিসে অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ বা শুল্ক আদায়কারী ব্যক্তিকে ‘সাহিবু মাক্স’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন তাওবাকারী নারী সাহাবির ঘটনা প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেছেন, ‘সে এমন তাওবা করেছে যে একজন মাক্স গ্রহণকারীও যদি এমন তাওবা করত, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো।’

(মুসলিম, হাদিস ৪৩২৪)

এতে মানুষের ওপর অন্যায় আর্থিক বোঝা চাপানোর ব্যাপারে ইসলামের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি উঠে আসে।

মানুষের অধিকার নষ্ট করলে শুধু তাওবা যথেষ্ট নয়
চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ডে শুধু আল্লাহর হক নয়, মানুষের অধিকারও জড়িত। কেউ অন্যায়ভাবে কারও অর্থ বা সম্পদ গ্রহণ করলে শুধু মুখে তাওবা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সম্ভব হলে অন্যায়ভাবে নেওয়া অর্থ বা সম্পদ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আদায় করা প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্মান বা অন্য কিছুতে কোনো জুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার আগেই সে যেন আজই তার নিকট হতে ... নিজেকে মুক্ত করে নেয়।’

(বুখারি, হাদিস ২৪৪৯, ৬৫৩৪; তিরমিজি, হাদিস ২৪১৯)

এই নির্দেশনা থেকে মানুষের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া তাওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।

শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে প্রতিরোধ জরুরি
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি কোনো সুস্থ সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। সন্ত্রাস মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, আর চাঁদাবাজি মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে। এর ফলে সমাজে ভয়, অবিশ্বাস, অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাই জুলুম, ভয়ভীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অন্যের অধিকার হরণের মতো কর্মকাণ্ড থেকে ব্যক্তি ও সমাজকে মুক্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায়, সততা, পারস্পরিক সম্মান এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার ওপর ইসলামী শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement