যাঁদের ২০২৫ সালে হারিয়েছি
Published : ০৫:৪৩, ৬ জানুয়ারি ২০২৬
বিদায়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ২০২৫ সাল। আর মাত্র কয়েক দিন, আরেকটি নতুন বছরের সূচনা। ২০২৬ আমাদের দোরগোড়ায়। বিদায়ী বছরটি ছিল দুঃখ ও বিষাদের বছর।
রাজনৈতিক, শিক্ষাগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমরা হারিয়েছি অনেক চেনামুখ। এ বছরের প্রতিটি বিদায়ী মানুষই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখে গেছেন, তাদের স্মৃতি আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে চিরকাল।
বছরের শেষটি এসেছে এক দুঃসংবাদ দিয়ে—বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু। গত মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর সকালে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জানাজার কার্যক্রম আগামী ৩১ ডিসেম্বর অর্থাৎ বুধবার অনুষ্ঠিত হবে।
দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জানাজার কর্মসূচি সম্পন্ন হবে এবং আনুমানিক বেলা সাড়ে ৩টায় শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হবে। মৃত্যুর প্রেক্ষিতে আগামী তিনদিন রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে এবং জানাজার দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার আগে চলতি মাসে আমরা হারিয়েছি আরেক জনকে—ইনকিলাব মঞ্চের মুখপত্র শরিফ ওসমান হাদি, যিনি ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি আহত হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বেগম খালেদা জিয়া ও শরিফ ওসমান হাদির পাশাপাশি আমরা হারিয়েছি আরও কয়েকজন বিশিষ্টজনকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, রবীন্দ্রগবেষক ও সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন, খ্যাতিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র, প্রখ্যাত চিত্রনায়িকা ও নৃত্যশিল্পী অঞ্জনা রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন, লেখক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর।
বিদায়ী বছরের শুরুতেই আমরা হারিয়েছি ঢাকাই সিনেমার দাপুটে নায়িকা অঞ্জনা রহমানকে। ৪ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন সপ্তাহের অসুস্থতার পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ‘দস্যু বনহুর’ খ্যাত নায়িকা।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। পরদিন ৫ জানুয়ারি খ্যাতিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। প্রবীর মিত্র ৮১ বছর বয়সী ছিলেন এবং কিছু শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ১৩ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
চলতি বছরের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মস্তিষ্কে স্ট্রোক ও রক্তক্ষরণজনিত কারণে বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এর আগে তিনি কয়েক দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। একই বছরের ২৫ মার্চ মারা যান ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা, সংস্কৃতিক ব্যক্তি, রবীন্দ্রগবেষক ও সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
৭ সেপ্টেম্বর লেখক, গবেষক, রাজনীতিক এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ঢাকার শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
১৩ সেপ্টেম্বর দেশের সংগীতাঙ্গন হারায় কিংবদন্তি লালন সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনকে। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভুগে চিকিৎসকরা শেষ চেষ্টা করলেও তিনি চলে যান না-ফেরার দেশে। ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া ফরিদা পারভীন ৫৫ বছর ধরে গানে গানে জীবন অতিবাহিত করেছেন।
১০ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
৩ অক্টোবর তিনি রাজধানীর ধানমন্ডিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে যাওয়ার পথে গাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকরা জানান, তাঁর ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছে এবং পরে সেখানে হৃদযন্ত্রে স্টেন্টিং করা হয়।
২০২৫ সাল শেষ হচ্ছে দুঃখ ও ক্ষতির বার্তা নিয়ে। তবে এই বিশিষ্টজনদের স্মৃতি, অবদান এবং প্রতিভা চিরকাল আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে। এরা আমাদের মনে রেখে গেছেন আলোকিত পদচিহ্ন, যা নতুন বছরেও আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।
বিডি/এএন



































