ভেনেজুয়েলার পর যে পাঁচ দেশ উপর নজরে থাকতে পারে ট্রাম্পের

ভেনেজুয়েলার পর যে পাঁচ দেশ উপর নজরে থাকতে পারে ট্রাম্পের ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৮:৫৫, ৬ জানুয়ারি ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই তার প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হচ্ছে। বৈশ্বিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নতুন করে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই একের পর এক কঠোর বার্তা ও পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি।

সম্প্রতি এক নাটকীয় রাতের অভিযানে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি কম্পাউন্ড থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার ঘটনায় ট্রাম্প তার হুমকির বাস্তব রূপ দেখান। এ অভিযানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিনের কথা টেনে এনে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে এবার তিনি এটিকে নতুন নামে অভিহিত করেছেন—‘ডনরো ডকট্রিন’।

ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর গত কয়েক দিনে ওয়াশিংটন আরও কয়েকটি দেশ ও অঞ্চলের প্রতি কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো।

গ্রিনল্যান্ড
গ্রিনল্যান্ডে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—পিটুফিক স্পেস বেস। তবে ট্রাম্পের লক্ষ্য শুধু ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি পুরো দ্বীপটিকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনতে আগ্রহী। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয়। তার দাবি, অঞ্চলটি রুশ ও চীনা জাহাজে ভরে যাচ্ছে।

ডেনমার্কের অংশ এই বিশাল আর্কটিক দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ, যা স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং সামরিক প্রযুক্তি তৈরিতে অপরিহার্য। বর্তমানে এই খাতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে গেলে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডরিক নিলসেন ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘কল্পনাপ্রসূত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, কোনো চাপ বা সংযুক্তির চিন্তা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংলাপে তারা প্রস্তুত।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেনও সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না এবং ডেনমার্কের অবস্থান ইউরোপীয় সমর্থনে শক্তিশালী।

কলম্বিয়া
ভেনেজুয়েলা অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সতর্ক করে ‘নিজের দিকে খেয়াল’ রাখতে বলেন। কলম্বিয়া তেল, সোনা, রূপা, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লার বড় উৎপাদক দেশ। একই সঙ্গে এটি কোকেনসহ মাদক পাচারের একটি বড় কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকেই পেত্রোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের টানাপোড়েন বাড়ছে। অক্টোবরে পেত্রোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়া এমন একজন নেতার হাতে পরিচালিত হচ্ছে, যিনি কোকেন উৎপাদন ও পাচার পছন্দ করেন। সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার কাছে ‘খারাপ শোনাচ্ছে না’। যদিও ঐতিহাসিকভাবে কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং প্রতিবছর বিপুল সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে।

ইরান
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিয়েও ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর আবারও দমন-পীড়ন চালানো হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে।

যদিও ইরান ডনরো ডকট্রিনের আওতার বাইরে, তবুও পারমাণবিক স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টি দেশটির দিকে আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে বৈঠকেও ইরান ইস্যু আলোচনার শীর্ষে ছিল। মার্কিন গণমাধ্যমের দাবি, ২০২৬ সালে নতুন করে হামলার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

মেক্সিকো
মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ ট্রাম্পের পুরোনো রাজনৈতিক স্লোগান। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরেই তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।

মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে মেক্সিকো যথেষ্ট করছে না—এমন অভিযোগ করে ট্রাম্প বলেছেন, কার্টেলগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাম যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।

কিউবা
ফ্লোরিডার উপকূল থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরের কিউবা দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায়। ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র এই দেশটি সম্পর্কে ট্রাম্প বলেছেন, কিউবা এখন ‘পতনের মুখে’, তাই সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন নেই।

তার মতে, ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ বন্ধ হলে কিউবার অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবায় শাসন পরিবর্তনের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান নিয়ে আসছেন। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট যখন কথা বলেন, তখন তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়াই উচিত।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আরও আক্রমণাত্মক ও প্রভাব বিস্তারে দৃঢ় অবস্থানে যাচ্ছে—যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করছে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement