আবাসন খাতে সংকট, গৃহঋণের সুদ ৫ শতাংশ করার দাবি রিহ্যাব সভাপতির

আবাসন খাতে সংকট, গৃহঋণের সুদ ৫ শতাংশ করার দাবি রিহ্যাব সভাপতির ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি

Published : ১৪:৪৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬

দেশের আবাসন খাতে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদে গৃহঋণ এবং ফ্ল্যাটের ক্রেতা সংকটের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা বাড়ার পাশাপাশি অনেক চলমান প্রকল্পের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। এতে আবাসনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গ্রাহকপর্যায়ে গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, আবাসন ব্যবসায়ীদের এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়া, ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল।

তাঁর আশঙ্কা, কার্যকর নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে আবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসনকে কেবল ব্যবসায়িক খাত হিসেবে দেখলে চলবে না। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধিতে চাপে আবাসন ব্যবসা
রিহ্যাব সভাপতির দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও ১২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আর্থিক চাপে পড়ছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো।

ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। ক্রেতারা কয়েক বছর আগে ফ্ল্যাট কেনার চুক্তি করে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করেন। চুক্তির পর নির্মাণসামগ্রীর দাম ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলেও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকে। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ ব্যবসায়ীদের বহন করতে হয়।

তাঁর মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা আর্থিক চাপ সামাল দিতে পারলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন। ইতোমধ্যে কিছু প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমেছে।

উচ্চ সুদে কমছে ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা
ফ্ল্যাটের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, গৃহঋণের উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর ভাষ্য, ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; বরং বর্তমান বাজারদরে অনেকের পক্ষে ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।

ড. আলী আফজালের মতে, করোনাকাল থেকে আবাসন খাতের সংকট বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও প্রভাবিত করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগ করা অর্থ ও অর্জিত মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আবাসন সংকটে প্রভাবিত ২৭০টি সংযুক্ত শিল্প
আবাসন খাতের মন্দার প্রভাব শুধু ফ্ল্যাট নির্মাতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রিহ্যাব সভাপতির তথ্য অনুযায়ী, রড, সিমেন্ট, সিরামিক ও ফার্নিচারসহ প্রায় ২৭০টি সংযুক্ত শিল্প এ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ফ্ল্যাট নির্মাণ কমে গেলে এসব শিল্পের পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি কমে যায়। উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণ পরিশোধেও চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে আবাসন খাতের সংকট বৃহত্তর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ড. আলী আফজালের দাবি, দেশের আবাসন খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত। প্রকল্প কমে যাওয়া ও নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। তবে চাকরি হারানো মানুষের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাঁর কাছে নেই বলে জানান তিনি।

ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানোর আহ্বান
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন, কর ও সংশ্লিষ্ট ফি ক্রেতাদের জন্য বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি করছে বলে মনে করেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর ভাষ্য, এসব খাতে মোট ব্যয় ফ্ল্যাটের মূল্যের প্রায় ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক ক্রেতা ফ্ল্যাট কেনার পরও নিবন্ধন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেন। প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধন এবং ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে ক্রেতারা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ডিজিটাল অনুমোদনপ্রক্রিয়ার প্রস্তাব
আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ড. আলী আফজাল। জমি ও ভবনের নকশা অনুমোদনসহ সরকারি সেবাগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ে। এতে নির্মাণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের ওপর পড়ে।

গ্রাহকপর্যায়ে গৃহঋণের সুদ ৫ শতাংশ করার দাবি
মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন সহজলভ্য করতে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, ঋণের সুদ কমানো গেলে ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা বাড়বে এবং বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি হবে।

তিনি আরও প্রস্তাব করেন, বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গৃহঋণের সুদহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। ঢাকায় তুলনামূলক বেশি সুদে, জেলা শহরে কম সুদে এবং উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১ শতাংশ সুদে গৃহঋণের ব্যবস্থা করা গেলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমতে পারে।

পাশাপাশি আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও চান তিনি। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান প্রকল্প শেষ করার পাশাপাশি নতুন প্রকল্প গ্রহণে উৎসাহিত হবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন
সাধারণ মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, কৃষিজমির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এড়িয়ে অব্যবহৃত সরকারি জমিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকারি জমির সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও দক্ষতা যুক্ত করা গেলে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের সুযোগ বাড়বে।

তিনি বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক আবাসন পরিকল্পনা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে যাতায়াত সহজ করতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে ঢাকার বাইরে বসবাসের আগ্রহ বাড়তে পারে এবং রাজধানীর আবাসন চাহিদার ওপর চাপ কমতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতিসহায়তা প্রয়োজন
আবাসন খাতের সংকট মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের উদ্যোগের সুফল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছানো জরুরি।

তিনি মনে করেন, নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, গৃহঋণের সুদ কমানো এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে আনার পাশাপাশি সরকারি সেবায় দীর্ঘসূত্রতা কমানো গেলে আবাসন খাতে নতুন গতি ফিরতে পারে।

ড. আলী আফজালের মতে, সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সাশ্রয়ী অর্থায়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ফ্ল্যাটের চাহিদা বাড়বে, সংযুক্ত শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement