মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার উদ্যোগ দেশটির ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা এবং নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে।
ক্যাপিটল হিল থেকে শুরু করে বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহল—সবখানেই এই প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক আপত্তি উঠেছে। এমনকি রিপাবলিকান দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা, যারা আগে ট্রাম্পের ভেনিজুয়েলা–সংক্রান্ত নীতির পক্ষে ছিলেন, তারাও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে রাজি নন।
মার্কিন বিশ্লেষক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, এত বিশাল একটি দ্বীপ অধিগ্রহণ করতে গেলে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হিসেবে দেখছে। তবে ডেনমার্কের অধীনস্থ গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো প্রশ্নই ওঠে না—ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড কেনার সম্ভাব্য প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প এই বিষয়টিকে ‘অগ্রাধিকারভিত্তিক ইস্যু’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। আগামী সপ্তাহে মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে, যেখানে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ড স্পষ্ট করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অধীন যেতে চায় না এবং ডেনমার্কের অংশ হিসেবেই থাকতে আগ্রহী। একই সুরে কথা বলেছেন গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদমন্ত্রী নাজা নাথানিয়েলসেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ দ্বীপবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে গ্রিনল্যান্ডে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে, তবে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা খুবই কম। বিকল্প হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি ‘মুক্ত সংশ্লিষ্টতা’ চুক্তির কথা ভাবা হচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তা সহযোগিতার বিনিময়ে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্পের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড দখল মানে সেখানে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা—যা গুয়াম, আমেরিকান সামোয়া বা পুয়ের্তো রিকোর মতো অঞ্চলগুলোর সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। তবে গ্রিনল্যান্ডবাসী এই ধারণা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। গত বছরের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চান না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই আগ্রহের পেছনে গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য স্বাধীনতার বিষয়টিও বড় কারণ। ভবিষ্যতে যদি গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলে রাশিয়া বা চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির জন্য সেখানে কৌশলগত সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে পারে, কিন্তু জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা ন্যাটো জোটের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। এরই মধ্যে ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্ররা একযোগে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস বেসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দিয়ে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কড়া অবস্থানের মূল লক্ষ্য সামরিক হস্তক্ষেপ নয়; বরং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে আলোচনার টেবিলে এনে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক কূটনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করা।

































