যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়, বাতিল ১৩ হাজার ফ্লাইট

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়, বাতিল ১৩ হাজার ফ্লাইট ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১১:৪৫, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬

ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নেমে এসেছে ব্যাপক বিপর্যয়। নিউ মেক্সিকো থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে তুষারপাত ও বরফের তীব্রতার কারণে প্রায় ১৩ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

একই সঙ্গে লাখো মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন এবং অন্তত এক ডজন অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

শীতকালীন ঝড় আঘাত হানার পর স্থানীয় সময় শনিবার (২৪ জানুয়ারি) থেকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। খবর এনডিটিভি।

বার্তাসংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউ মেক্সিকো থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ১৪ কোটি মানুষ— যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি— শীতকালীন ঝড়ের সতর্কতার আওতায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত দক্ষিণ রকি পর্বতমালা হয়ে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি ও বৃষ্টি হতে পারে।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন তীব্র শীত অব্যাহত থাকতে পারে। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের আবহাওয়াবিদ অ্যালিসন স্যান্টোরেলি বলেন, তুষার ও বরফ খুব ধীরে গলবে এবং দ্রুত সরে যাবে না। এর ফলে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে শনিবার পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্তত এক ডজন অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছেন। আরও কিছু অঙ্গরাজ্যে একই ধরনের ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম জানান, ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (ফেমা) আগে থেকেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ত্রাণসামগ্রী, জনবল ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, সম্ভব হলে ঘরে থাকুন এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিন।

দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ লাইন মেরামতের কাজ শুরু হলেও পূর্বাঞ্চলের কিছু রাজ্যে বাসিন্দাদের জন্য শেষ মুহূর্তে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল শনিবার বলেন, বহু বছর পর এমন ভয়াবহ ঝড়ের মুখোমুখি হচ্ছে তার রাজ্য। তিনি ভারী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটার নির্ধারণ করেন। তার মতে, এই সপ্তাহান্তে ঘরের ভেতরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।

আবহাওয়াবিদদের মতে, যেসব এলাকায় ব্যাপক বরফ জমেছে, সেখানে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হারিকেনের সমতুল্য হতে পারে। শনিবার ঝড়ের প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর মধ্যে টেক্সাস ও লুইজিয়ানায় প্রায় ৫০ হাজার করে গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। লুইজিয়ানা সীমান্তসংলগ্ন টেক্সাসের শেলবি কাউন্টিতে বরফের ভারে পাইনগাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইন ছিঁড়ে পড়ে। এতে কাউন্টির প্রায় ১৬ হাজার বাসিন্দার এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় পড়ে।

শেলবি কাউন্টির কমিশনার স্টিভি স্মিথ বলেন, শত শত গাছ উপড়ে পড়েছে এবং রাস্তায় ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে। দ্রুত সড়ক পরিষ্কারের কাজ চলছে, তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।

লুইজিয়ানার ডেসোটো প্যারিশেও গাছ পড়ে গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এবং বাড়ির ওপর গাছ ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় শেরিফ দপ্তরের মুখপাত্র মার্ক পিয়ার্স জানান, গাছগুলো পুরোপুরি বরফে ঢেকে গেছে এবং ডালপালা মাটিতে ঝুলে আছে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ও রোববার মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ১৩ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ওকলাহোমা সিটির উইল রজার্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবারের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয় এবং রোববার সকালের ফ্লাইটও বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ রোববার বিকেল থেকে পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা করছে।

ডালাস-ফোর্ট ওর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার ৭০০টির বেশি ফ্লাইট ছাড়েনি এবং প্রায় সমানসংখ্যক আগমন ফ্লাইট বাতিল করা হয়। শিকাগো, আটলান্টা, ন্যাশভিল ও নর্থ ক্যারোলিনার শার্লট শহরের বিমানবন্দরগুলোতেও ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।

এ ছাড়া ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগ্যান জাতীয় বিমানবন্দর থেকে রোববার ছাড়ার কথা থাকা প্রায় সব ফ্লাইট শনিবার বিকেলের মধ্যেই বাতিল করা হয়।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে কর্মকর্তারা উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সূর্যাস্তের আগেই রাস্তাঘাট ছাড়ার এবং অন্তত ৪৮ ঘণ্টা ঘরে থাকার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। অঙ্গরাজ্যের প্রধান আবহাওয়াবিদ উইল ল্যানক্সটন বলেন, এটি সম্ভবত গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বরফঝড় হতে যাচ্ছে এবং এর পর আরও অস্বাভাবিক ঠান্ডা পড়তে পারে।

তিনি বলেন, বরফ ও তুষারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বরফে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বিদ্যুৎ লাইন ও গাছ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চল অতিক্রম করার পর ঝড়টি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হবে। ওয়াশিংটন থেকে নিউইয়র্ক ও বোস্টন পর্যন্ত এলাকায় ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাত হতে পারে।

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি শনিবার নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, সম্ভব হলে গাড়ি চালানো বা ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। এমন কিছু করবেন না যাতে আপনি বা আপনার পরিবার ঝুঁকিতে পড়েন। রসিকতার ছলে তিনি বলেন, ঘরে থাকুন, গরম পোশাক পরুন, টিভিতে পুরোনো সিনেমা দেখুন— সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বাইরে না যাওয়া।

এপি জানায়, মিডওয়েস্ট অঞ্চলে অনুভূত তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে নেমে গেছে, যা ১০ মিনিটের মধ্যেই ত্বকে ফ্রস্টবাইটের ঝুঁকি তৈরি করে। উইসকনসিনের রাইনল্যান্ডারে শনিবার সকালে মাইনাস ৩৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

মিনিয়াপোলিসে চরম শৈত্যপ্রবাহ কিছুটা কমলেও অভিবাসন দপ্তর আইসিইর বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের মাইনাস ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে।

এদিকে ফিলাডেলফিয়া ও হিউস্টনের শিক্ষা কর্মকর্তারা সোমবার স্কুল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও ক্লাস বাতিল করেছে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement