রাশিয়ায় চাকরির নামে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে বাংলাদেশিরা
Published : ১৭:৩৩, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের আশ্বাসে দেশ ছেড়েছিলেন বাংলাদেশের মাকসুদুর রহমান। তবে সেখানে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, বাস্তবে তিনি কাজের জায়গায় নয় ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ সম্মুখসারিতে এসে পড়েছেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বেসামরিক চাকরির ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের রাশিয়ায় আনা হচ্ছে। পরে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক চুক্তিতে সই করিয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। এতে বাধা দিলে মারধর, কারাবন্দি কিংবা প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এপি জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম তিন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের একজন মাকসুদুর রহমান। তিনি জানান, মস্কোতে পৌঁছানোর পর তাকে ও আরও কয়েকজন বাংলাদেশিকে রুশ ভাষায় লেখা কিছু নথিতে সই করতে বলা হয়। পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল সামরিক নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তিপত্র।
চুক্তিতে সই করানোর পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি সেনা ক্যাম্পে। সেখানে ড্রোন পরিচালনা, আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়া এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহারের মতো বিষয়ে প্রাথমিক যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এপিকে দেওয়া বর্ণনায় ওই তিন বাংলাদেশি বলেন, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফ্রন্টলাইনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করা হয়। রুশ বাহিনীর অগ্রাভিযানের আগে তাদেরই এগিয়ে যেতে হতো। রসদ বহন, আহত সেনাদের উদ্ধার এবং নিহতদের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার কাজও করতে হয়েছে তাদের।
এ ছাড়া নিখোঁজ তিন বাংলাদেশির পরিবার জানিয়েছে, তাদের স্বজনরা ফোনে একই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকার—কেউই কোনো মন্তব্য করেনি।
এপির অনুসন্ধানে শ্রমিকদের বক্তব্যের পক্ষে বেশ কিছু নথিপত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সামরিক চুক্তি, মেডিকেল রিপোর্ট, পুলিশি প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ছবি। এসব নথিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেওয়া ভিসা, যুদ্ধক্ষেত্রে পাওয়া আঘাত এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ঠিক কতজন বাংলাদেশি এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি। তবে যাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তারা জানিয়েছেন ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর সঙ্গে তারা শত শত বাংলাদেশিকে দেখেছেন।
মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়া শুধু বাংলাদেশ নয়—আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষ করে ভারত ও নেপালের পুরুষদেরও সামরিক নিয়োগের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
এপি জানায়, ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় চুক্তিভিত্তিক কাজ শেষ করে দেশে ফেরেন মাকসুদুর রহমান। এরপর তিনি নতুন কাজের সন্ধানে ছিলেন। সে সময় এক দালাল তাকে রাশিয়ার একটি সামরিক ক্যাম্পে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির বিজ্ঞাপন দেখান। মাসিক এক হাজার থেকে দেড় হাজার ডলার বেতন এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগের কথাও বলা হয়।
অন্যদিকে, মোহন মিয়াজী রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের একটি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়ে চরম শীত ও কঠোর পরিবেশে বিপর্যস্ত হন। পরে অনলাইনে নতুন কাজ খুঁজতে গিয়ে এক রুশ সেনা নিয়োগকারীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে অধিকৃত শহর আভদিভকার একটি সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি কাগজপত্র দেখিয়ে কমান্ডারকে জানান, তাকে ইলেকট্রিক্যাল কাজের জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তার অভিযোগ, আদেশ মানতে অস্বীকার করায় তাকে বেলচা দিয়ে মারধর করা হয়, হাতকড়া পরিয়ে বেসমেন্টের একটি কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়।
বিডি/এএন


































