শীত এলেই বাড়ে পিঠের ব্যথা: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টাইমে তারেক রহমান

শীত এলেই বাড়ে পিঠের ব্যথা: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টাইমে তারেক রহমান ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০০:০৫, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

টানা ১৭ বছর পর দেশে ফেরার পরই তারেক রহমান যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসনের জীবন শেষ করে গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় পা রাখার পর থেকেই সময় যেন তাঁর জন্য ত্বরান্বিত গতিতে এগোচ্ছে।

বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছিল লাখো মানুষ। এর মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই ঘটে যায় এক বৃহৎ ব্যক্তিগত এবং জাতীয় ঘটনা—তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শোক ও আবেগের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান ধীরস্বরে, সংযত ভঙ্গিতে কথা বলেছেন। কণ্ঠে ক্লান্তি স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, ‘খুব ঠান্ডা শীত এলে এখনো পিঠে ব্যথা হয়। এটা কারাগারে আমার ওপর চালানো নির্যাতনের ফল। কিন্তু আমি এটাকে বোঝা মনে করি না। বরং এটা আমাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।’

২০০৭–০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তিনি ১৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন। সেই সময়ের শারীরিক নির্যাতনের প্রভাব আজও তাকে ভোগাচ্ছে। মূলত চিকিৎসার জন্যই তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। সেই নির্বাসনই পরে দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনে রূপ নেয়।

দেশে ফেরার পরপরই তারেক রহমানের সামনে আসে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে এগিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দলটির সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর, যেখানে প্রাণ গেছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের।

সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেছেন এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে—একদিকে মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি শুধু বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে নয়, আমার দলের কর্মী-সমর্থকেরাই আমাকে এখানে এনেছেন।’

প্রতিবেদনটিতে অতীত শাসনামলের রাজনৈতিক বাস্তবতাও উঠে এসেছে। ২০০১–০৬ মেয়াদে বিএনপির দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তারা কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।’

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, কমতে থাকা বৈদেশিক রিজার্ভ এবং বছরে প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন। যুব বেকারত্ব প্রায় ১৩ শতাংশের বেশি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারেক রহমান পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

তিনি ১২ হাজার মাইল দীর্ঘ খাল খননের প্রস্তাব করেছেন, বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা এনেছেন, ঢাকায় নতুন সবুজ এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন, প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি শিক্ষায় সংস্কার প্রস্তাব করেছেন এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্বে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেই মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’

আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক আগ্রহ, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক—এসব আগামী সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তিনি সতর্ক, তবে বাস্তববাদী অবস্থান প্রকাশ করেছেন।

দেশে নতুনভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে, মব, সংখ্যালঘু ও নারীদের ওপর হামলা, ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামের উত্থান এবং তরুণদের মধ্যে তাদের প্রভাব নিয়েও। তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, যাতে মানুষ রাস্তায় ও ব্যবসায় নিরাপদ থাকে।’

ব্যক্তিগত জীবনের দিক থেকে টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অন্তর্মুখী। লন্ডনে সময় কাটাতেন রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি ও ইতিহাসের বই পড়ে। প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ তিনি আটবার দেখেছেন। দেশে ফেরার পর তাঁর স্বাধীনতা সীমিত—চারপাশে কাঁটাতারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চলাফেরায় বিধিনিষেধ। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাটাই সবচেয়ে বেশি মিস করি।’

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement