অনেক ক্ষেত্রেই আমরা শরীরের কিছু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিই না। হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি অনুভব করা বা শরীরের কোথাও গাঁট কিংবা ফোলাভাব দেখা দিলে তা অনেকেই ব্যস্ত জীবনের চাপের কারণে ‘সাধারণ অসুস্থতা’ বলে ধরে নেন।
সময়ের অভাব বা অবহেলার কারণে এসব উপসর্গ উপেক্ষিতই থেকে যায়। অথচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হওয়া লক্ষণগুলোই ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের প্রাথমিক সতর্ক বার্তা হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ক্যানসারের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেই রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। আরও আশাব্যঞ্জক তথ্য হলো—ক্যানসার যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই তা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য। সে কারণে শরীরের কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
এ বিষয়ে ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালের কনসালটেন্ট সার্জন অনকোলজিস্ট ডা. অজেশ রাজ সাক্সেনা বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা। তার মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নির্দিষ্ট বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে অসংখ্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
ক্যানসারের ৮টি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সতর্ক সংকেত
১. অকারণে ওজন কমে যাওয়া
খাবারের পরিমাণ বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন না থাকলেও যদি ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে শরীরের ওজন ৫ শতাংশ বা তার বেশি কমে যায়, তবে তা অন্ত্র, অগ্ন্যাশয় কিংবা ফুসফুসের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
২. বিশ্রামেও না কমা ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রামের পরও যদি ক্লান্তি দূর না হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে অবসন্নতা অনুভূত হয়, তাহলে এটি লিউকেমিয়া, কোলন বা পাকস্থলীর ক্যানসারের ইঙ্গিত হতে পারে।
৩. শরীরের কোথাও গাঁট বা ফোলা
শরীরের কোনো অংশে গাঁট বা ফোলাভাব তৈরি হয়ে যদি তা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় কিংবা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তাহলে সেটিকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
৪. ত্বক বা তিলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
ত্বকের রঙ, তিলের আকার, রং বা প্রান্তের সীমারেখায় পরিবর্তন দেখা দিলে তা ত্বকের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
৫. দীর্ঘদিন ভালো না হওয়া ঘা
মুখগহ্বর, ত্বক বা যৌনাঙ্গে এমন কোনো ঘা যা দীর্ঘ সময়েও শুকায় না বা ভালো হয় না, সেটি মুখগহ্বর কিংবা ত্বকের ক্যানসারের ইঙ্গিত দিতে পারে।
৬. মল-মূত্রের অভ্যাসে পরিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, মলের সঙ্গে রক্ত কিংবা প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে তা কোলন, মূত্রথলি বা কিডনির ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
৭. অস্বাভাবিক রক্তপাত বা নিঃসরণ
মাসিকের বাইরে রক্তপাত, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা কিংবা স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ—এসবই ক্যানসারের সম্ভাব্য সতর্ক সংকেত।
৮. তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী কাশি বা কণ্ঠ ভাঙা
তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশি বা কণ্ঠস্বর ভাঙা থাকলে, বিশেষ করে ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে, এটি ফুসফুস বা গলার ক্যানসারের প্রাথমিক উপসর্গ হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, কোনো উপসর্গ যদি টানা ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় বা ধীরে ধীরে তীব্রতা বাড়তে থাকে, তাহলে সেটিকে ‘সাধারণ সমস্যা’ ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ক্যানসার নিরাময়ে নতুন সম্ভাবনা
ক্যানসার মানেই মৃত্যুদণ্ড—এই ধারণা এখন আর পুরোপুরি সত্য নয়। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যানসার আজ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং নিরাময়যোগ্য রোগে পরিণত হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও উন্নত প্রযুক্তির ফলে বর্তমানে বহু ধরনের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
এ কারণে নিজের শরীরের প্রতি সচেতন থাকা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং ঝুঁকি অনুযায়ী স্ক্রিনিং করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের বয়স ৪০ বছরের বেশি কিংবা যাদের পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত ও চিকিৎসাই সুস্থ জীবনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়।


































