১৭ বছর পর দেশে ফিরে বাংলাদেশে তারেক রহমানের নতুন শুরু

১৭ বছর পর দেশে ফিরে বাংলাদেশে তারেক রহমানের নতুন শুরু ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০০:২৯, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

১৭ বছরের নির্বাসনের পর দেশে ফিরে এসেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘদিন লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে কাটানো সময়ের পর দেশে ফেরার মুহূর্তে তিনি আবারও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে।

যদিও কণ্ঠ আগের মতো শক্তিশালী নয় এবং শরীর পুরোপুরি সুস্থ নয়, তবু বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের রাজনৈতিক মনোজগতে এই মুহূর্তে তার নাম সবচেয়ে আলোচিত।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক দৃশ্যপটের মধ্যে তারেক নিজেকে উপস্থাপন করছেন এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে। একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে ‘জেন–জি’ প্রজন্মের নতুন আশা ও আকাঙ্ক্ষা।

২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরার সময় বিমানবন্দর পুরোপুরি ভরে ওঠে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে। এটি প্রমাণ করে, তিনি শুধু একটি দলের নেতা নন, বরং ক্ষমতার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছেন।

ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু, এই প্রত্যাবর্তনকে আরও আবেগঘন করে তোলে। মায়ের শেখানো কথাই তার জন্য দিকনির্দেশনা—‘দায়িত্ব এলে তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না’। এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি এগোতে চান।

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন সরকার গঠনের লড়াইয়ে তারেক রহমানকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিএনপির সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ, আর জামায়াতে ইসলামের সমর্থন প্রায় ১৯ শতাংশ।

তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে গভীর শঙ্কা। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারকে দুর্নীতির অভিযোগে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং দেশের চার বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এই ইতিহাস এখনও অনেক সংস্কারপন্থি মানুষকে ভাবায়। এছাড়া, জুলাই আন্দোলনে নিহত প্রায় ১,৪০০ মানুষের রক্ত যেন আরেকটি স্বৈরাচারী শাসনের দিকে না যায়—এই ভয় সমাজে এখনও রয়ে গেছে।

৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান নিজেকে নীতিনির্ধারণে আগ্রহী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তিনি দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা আগের রায় অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছে। তিনি বলেন, সেই সব অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই। তবে সমালোচকেরা মনে করছেন, তিনি সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, যার বিরুদ্ধে মানুষ রাজপথে আন্দোলন করেছিল।

বর্তমান বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, টাকার মান কমছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। শিল্প ও জ্বালানি খাতেও চাপ বেড়েছে। যুব বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, এবং প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।

তারেক রহমানের পরিকল্পনায় রয়েছে: খাল খনন, বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানো, ঢাকায় নতুন সবুজ এলাকা সৃষ্টি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যখাতে অংশীদারিত্ব। তিনি আশাবাদী, ‘যদি ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, মানুষ আমাকে সমর্থন করবে’।

জুলাই আন্দোলনের পর দেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির প্রভাব বেড়েছে। জামায়াতের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনের সাফল্য—সব মিলিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স এবং নারীদের ওপর অনলাইনভিত্তিক হয়রানি। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা রাষ্ট্রের কার্যকারিতা ও কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

তারেক রহমান বলছেন, তার অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। মানুষ যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, ব্যবসা করতে পারে—এটাই তার মূল প্রতিশ্রুতি।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পলাতক শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং নয়াদিল্লির আওয়ামী লীগপন্থি অবস্থান তরুণদের চোখে ভারতকে নেতিবাচক করে তুলেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ শতাংশ শুল্ক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। তারেক রহমান ইঙ্গিত দিয়েছেন, বোয়িং উড়োজাহাজ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার পথ খোঁজা হতে পারে।

তারেক রহমান জানেন, শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকারী হয়ে আজকের বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয়। মানুষ চায়—কাঙ্ক্ষিত নেতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ। তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা আনা, দুর্নীতি ঠেকানো এবং আন্দোলন-পরবর্তী প্রত্যাশা পূরণ করা। তিনি স্মরণ করান, ক্ষমতার উচ্চতা যত, দায়িত্বের ভার তত বেশি। বর্তমানে তিনি ঠিক সেই দায়িত্বের পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement