মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে এক পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক গুরুতর কারিগরি ও মানগত ত্রুটির কথা জানিয়েছে। তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, নকশাগত দুর্বলতা এবং স্থাপনার সময় কারিগরি ভুলই ছিল এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সচিবালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান তদন্ত প্রতিবেদনটির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্ঘটনাটিকে একটি সম্পূর্ণ কারিগরি ও গুণগত মানজনিত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য প্রধানত তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, ব্যবহৃত বিয়ারিং প্যাডের মান অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে, এসব বিয়ারিং প্যাড নির্ধারিত ও প্রচলিত মানের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল, যা দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও কম্পন সহ্য করার উপযোগী নয়।
দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেলের নকশায় কিছু ত্রুটি ও বিচ্যুতি পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রেল চলাচলের সময় যে কম্পন সৃষ্টি হয়, তা ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় হচ্ছিল। এই অতিরিক্ত কম্পনই একপর্যায়ে বিয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেটি নিচে পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে।
তৃতীয়ত, স্থাপনার সময় কারিগরি নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বিয়ারিং প্যাডটি সমান্তরালভাবে বসানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা কিছুটা ঢালু অবস্থায় স্থাপন করা হয়েছিল। ফলে অতিরিক্ত কম্পনের প্রভাবে বিয়ারিং প্যাডটি সহজেই সরে গিয়ে নিচে পড়ে যায়।
ঘটনার পর বিভিন্ন মহলে নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সেই সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে নাকচ করে দেন। তিনি জানান, তদন্তে নাশকতার কোনো ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এটি সম্পূর্ণভাবে একটি কারিগরি ত্রুটিজনিত দুর্ঘটনা।
তিনি আরও বলেন, সরকার এই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে আরও গভীর ও নিবিড় তদন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়ে উপদেষ্টা আশ্বস্ত করে বলেন, বর্তমানে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে মেট্রোরেলের সব বিয়ারিং প্যাড নিয়মিতভাবে পরীক্ষা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের পশ্চিম প্রান্তে একটি পিলারের ওপর থেকে বিয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে আবুল কালাম নামে এক যুবক নিহত হন। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।






























