দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ: প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে এগিয়ে তারেক রহমান

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ: প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে এগিয়ে তারেক রহমান ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ২১:২৬, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যার এক বিশ্লেষণে সাময়িকীটি উল্লেখ করে, সুপরিচিত এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের পর দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রধান দাবিদার।

বিশ্লেষণে বলা হয়, এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রায় ১৮ মাস আগে ঘটে যাওয়া এক ‘বিপ্লব’-এর পর, যখন ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে সংঘটিত আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ওই শাসনামলকে হত্যাযজ্ঞ ও দুর্নীতিতে জর্জরিত বলেও আখ্যা দিয়েছে সাময়িকীটি।

দ্য ইকোনমিস্টের মতে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এই পূর্বাভাস এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুরূপ বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায়।

সাময়িকীটি ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘটনাও বর্ণনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বুলেটপ্রুফ বাসে করে ফেরার সময় রাস্তায় বিপুলসংখ্যক সমর্থক ভিড় করেন এবং তাদের উচ্ছ্বাসে বাসটি কয়েক মাইল পথ অত্যন্ত ধীরগতিতে অগ্রসর হয়, যেন অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে কাছ থেকে দেখতে পারেন।

দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। দেশের প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে আনুমানিক ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইপিএসএসের শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আমার জীবনের দুই দশক ধরে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, এখন রাজধানীর রাস্তাঘাটজুড়ে আবারও নির্বাচনী ব্যানার ও প্রচারণার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধান করাই হবে শেষ দায়িত্ব। তবে অধিকাংশ মানুষের মতে, এই সরকার অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এমন কিছু সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে নতুন করে স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাবে। এর মধ্যে রয়েছে একটি নতুন উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত রাখার প্রস্তাব।

জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, দলটি নির্বাচিত হলে ‘সব বাংলাদেশির জন্য সংযতভাবে শাসন করবে’ বলে দাবি করলেও তাদের অগ্রগতি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলটি এবারের নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। পাশাপাশি, যে দলটি অতীতে কখনও সংসদে ১৮টির বেশি আসন পায়নি, তাদের দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, এসব বিষয় তারেক রহমানের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে, কারণ তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।

সাময়িকীটি স্মরণ করিয়ে দেয়, দীর্ঘদিন বিএনপি পরিচালিত হয়েছে তার প্রয়াত মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এবং তার আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা, যিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার শাসনামলে বিএনপি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও নির্বাচিত হলে বিনিয়োগকারীদের সহায়তা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আরও বেশি তরুণ বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তিনি পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং প্রতি বছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগের কথাও বলেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তারেক রহমান মনে করেন তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন, কারণ ট্রাম্পকে তিনি একজন বাস্তববাদী ও ব্যবসায়িক মানসিকতার মানুষ হিসেবে দেখেন।

দ্য ইকোনমিস্ট আরও লিখেছে, তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেছেন—তার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। তিনি ২০২৪ সালের বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের বিচারের কথা বলেছেন, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৪ সালের বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে যেসব সরকার জনগণের জন্য কার্যকর কোনো কর্মসূচি রাখে না, তাদের পরিণতি কী হতে পারে। তিনি মনে করেন, প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব কারও জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।

দ্য ইকোনমিস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান জনমানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে এখনো অনেকেই ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার বদলে যায়—এই আশঙ্কায়।

পর্যবেক্ষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসা এই তারেক রহমানকে আগের তুলনায় ভিন্ন ও পরিণত মনে হচ্ছে।
সূত্র: বাসস

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement