পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা ৭.৫ ডিগ্রি, ঘনকুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে স্থবির হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চল

পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা ৭.৫ ডিগ্রি, ঘনকুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে স্থবির হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চল ছবি: সংগৃহীত

রংপুর প্রতিনিধি

Published : ২১:৫১, ৭ জানুয়ারি ২০২৬

পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা নেমেছে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর মৃদু শৈত্যপ্রবাহে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল। রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় বাড়ছে শীতের তীব্রতা।

ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ।

শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকায় উত্তরের জেলাগুলোতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ভোর ও রাতের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ কমে গেছে, কমেছে দৈনিক আয়ও। অনেক শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রাখছেন। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর নগরীর শীতবস্ত্রের বাজারগুলোতে ক্রেতার ভিড় চোখে পড়ার মতো। স্টেশন বাজার, জামাল মার্কেট, ছালেক মার্কেট, হনুমানতলা, হকার্স মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও ফুটপাতজুড়ে নতুন ও পুরনো শীতবস্ত্রের জমজমাট বেচাকেনা চলছে।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ সাশ্রয়ী দামে শীতের পোশাক ক্রয় করতে ভিড় করছেন পুরনো কাপড়ের দোকান ও অস্থায় দোকানগুলোতে। জাহাজ কম্পানি মোড়, সেন্ট্রাল রোড, পায়রাচত্ত্বর ও টার্মিনাল এলাকার ফুটপাতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বেচাকেনা অব্যাহত রয়েছে। ভ্যান চালক আমিনুল ইসলাম বলেন, দিনে যা আয় হয়, তাতে ঠিকমতো খাবার জোটানোই কষ্ট হচ্ছে। শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই।

পুরনো একটা জ্যাকেট কিনেছি, সেটাই ভরসা। শীত বাড়লেও আয় বাড়েনি, বরং কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, চলতি বছর পুরনো কাপড়ের দাম বেশি। পুরনো কাপড় আমদানির কোটা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে, যার সরাসরি চাপ পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।

শীতের তীব্রতায় অনেক মানুষ খড়কুটো, কাঠ কিংবা পরিত্যক্ত কাগজ জ্বালিয়ে ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছে। রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটানো এখন সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে। শৈত্যপ্রবাহের কারণে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ১ থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত জটিলতায় শিশু ও বয়স্কসহ প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছে। এসময় স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন শীতজনিত জটিলতায় মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠাণ্ডাজনিত জ্বরে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি। রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ডিসেম্বর মাসে এ অঞ্চলে গত আট দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। জানুয়ারি মাসেও পাঁচ দিন সূর্যের আলো দেখা যায়নি। তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে আরো দুই-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

আজ ৭ জানুয়ারি বুধবার সকাল ৬টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯৭ শতাংশ, যা শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় বলেন, সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬ থেকে ৮ কিলোমিটার। মঙ্গলবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আগামী কয়েকদিন শীতের এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। নীলফামারীর সৈয়দপুরে তাপমাত্রা নেমেছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ফলে তীব্র শীতে বিপাকে পড়েছে সর্বস্তরের মানুষ।

বুধবার সকাল সাড়ে ৭টায় সৈয়দপুরে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গত দুদিন সূর্যের দেখা মিলেনি। এ কারণেই শীত বেশি অনুভব হচ্ছে।  গত ৭ দিন তাপমাত্র ১০ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উঠানামা করলেও ৭ জানুয়ারি শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় কষ্টে দিন কাটাচ্ছে মানুষ।

সৈয়দপুরে শহরের ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ সংলগ্ন ফুচকা বিক্রেতা তৈমুর বলেন, গত দুইদিন সুর্যের দেখা মিলেনি।  তাপমাত্রাও উঠানামা করায় প্রচন্ড ঠান্ডায় ফুচকা বিক্রি করতে পারিনি। ফুচকা বিক্রি করতে ভ্যান নিয়ে বের হয়েছি ঠিকই কিন্তু ঠান্ডায় কিছুই করতে পারছি না। শহরের সৈয়দপুর-রংপুর সড়ক সংলগ্ন ইটের খোয়া বিক্রেতা রশিদ বলেন, গরীবের শান্তি নেই।

কনকনে ঠান্ডায় অনেকেই কম্বল গায়ে মুড়িয়ে সুয়ে আছে, আর গরীব পরিবারের সদস্যদের মুখের ভাত যোগাতেই প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝেও ইট ভাংছি খোয়া বিক্রি করার জন্য। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লোকমান হোসেন বলেন, দুইদিন সুর্যের দেখা মিলেনি ও তাপমাত্রা উঠানামা করায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে।

সকাল সাড়ে ৭টায় সৈয়দপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, শীত মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে।

প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা বাড়ানো হবে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যমান শীতের তীব্রতার তুলনায় সহায়তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত আরও কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। শীতে বিপর্যস্ত রংপুর অঞ্চলের মানুষ এখন প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের কার্যকর সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement