দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও দূরত্ব কাটিয়ে যুক্তরাজ্য–চীনের সম্পর্ক নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠকের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য বড় সুখবর দেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পর্যটন কিংবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ৩০ দিনের কম সময়ের জন্য এখন থেকে ব্রিটিশ নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই চীনে ভ্রমণ করতে পারবেন।
বৈঠক শেষে ডাউনিং স্ট্রিট ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা প্রকাশ করেছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তদেশীয় অপরাধ ও অবৈধ অভিবাসন রোধে যৌথ উদ্যোগ, সেবা খাতে বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন, যুক্তরাজ্য–চীন বাণিজ্যের সম্ভাব্যতা যাচাই, পণ্যের মান ও মানদণ্ড নির্ধারণে সহযোগিতা এবং যুক্তরাজ্য থেকে চীনে রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ। বিশেষ করে স্কচ হুইস্কির ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ‘ইউকে–চীন জয়েন্ট ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড কমিশন’-এর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা, আবাসন ও ক্রীড়া শিল্পে বিনিয়োগ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পশুপাখি ও উদ্ভিদ কোয়ারেন্টাইনে সমন্বয় এবং চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়গুলোও চুক্তির আওতায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত শুল্কনীতি ও মিত্র দেশগুলোর প্রতি কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটেই ব্রিটেন চীনের সঙ্গে একটি ‘পরিণত ও উন্নত সম্পর্ক’ গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছে। ট্রাম্পের ঘন ঘন বদলে যাওয়া বাণিজ্যনীতি এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য বিকল্প অর্থনৈতিক অংশীদার খুঁজছে।
চীনে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে স্টারমার গ্রেট হল অব দ্য পিপলে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রায় ৮০ মিনিট বৈঠক করেন। বৈঠকের পর তারা একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। এটি গত আট বছরে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। পরে স্টারমারের চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে।
বৈঠকের শুরুতে স্টারমার বলেন, চীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার পাশাপাশি মতপার্থক্য থাকলেও গঠনমূলক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার মতো একটি পরিণত সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন।
জবাবে সি চিন পিং বলেন, চীন ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক অতীতে বহু উত্থান–পতনের মধ্য দিয়ে গেছে, যা কোনো দেশের জন্যই লাভজনক ছিল না। তিনি জানান, চীন যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে প্রস্তুত এবং এমন সম্পর্ক চায়, যা ইতিহাসের বিচারে টিকে থাকবে।
বৈঠকের পরিবেশ ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। ফুটবলপ্রেমী সি চিন পিংকে স্টারমার উপহার দেন গত সপ্তাহে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও আর্সেনালের ম্যাচে ব্যবহৃত একটি ফুটবল। আলোচনায় স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যুর চেয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, আগের দিন গভীর রাতে বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর স্টারমার রাজধানীর একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় নৈশভোজ করেন, যা মাশরুমভিত্তিক খাবারের জন্য পরিচিত। এর আগে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যানেট ইয়েলেনও ওই রেস্তোরাঁয় খাবার খেয়েছিলেন।
































