ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি জানিয়েছে, দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে দেশের গৃহকর্ত্রীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামে একটি নতুন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হবে।
এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনার পাশাপাশি খরচ কমিয়ে সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে দাবি করছে দলটি। এসব বিষয়ে বিস্তারিত ও খোলামেলা আলোচনা করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাতে দলের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত প্রথম পডকাস্ট অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্দেশ্য, সুবিধা, কারা এই কার্ড পাবেন, সহায়তার পরিমাণ এবং এর মাধ্যমে পরিবার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—সে বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা দেন তিনি।
পডকাস্টের শুরুতেই একটি প্রতীকী ফ্যামিলি কার্ড হাতে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এটি দেশের কোটি কোটি মা ও বোনের জন্য পরিকল্পিত একটি কার্ড। তার ভাষায়, এই ছোট্ট কার্ডের নামই হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, যা বাংলাদেশের প্রতিটি মা ও গৃহিণীর হাতে পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
তিনি জানান, দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একসঙ্গে সব পরিবারকে কার্ড দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সে কারণে ধাপে ধাপে পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছানো হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে গৃহিণীরা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা পাবেন, যা নগদ অর্থ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে অথবা পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে।
ফ্যামিলি কার্ডের সুফল তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সরকারিভাবে এই সহায়তা পেলে প্রতিটি পরিবারই এর ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করবে। খরচের চাপ কমলে পরিবারগুলো সঞ্চয়ের সুযোগ পাবে।
সেই সঞ্চিত অর্থ মা-বোনেরা সন্তানের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির পেছনে ব্যয় করতে পারবেন, সন্তানদের লেখাপড়ায় খরচ করতে পারবেন কিংবা গ্রামীণ পর্যায়ে ছোটখাটো বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, গ্রাম বা শহর যেখানেই থাকুন না কেন, মানুষ ছোট পরিসরে হলেও কোনো না কোনো বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে নিতে পারবে।
সেই বিনিয়োগ থেকে সামান্য হলেও অতিরিক্ত আয় হলে তা সংসারের কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এভাবেই ফ্যামিলি কার্ডের সুফলভোগীরা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী ও সচ্ছল পরিবারের পথে এগোবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তারেক রহমান বলেন, কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন এই সহায়তা পেলে কি খুব দ্রুত সবাই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে যাবে? তার মতে, কয়েক দিনের মধ্যে তা সম্ভব নয়।
তবে পাঁচ, ছয় বা সাত বছর ধরে যদি একজন মা বা গৃহিণী এই সহযোগিতা পান, তাহলে ধীরে ধীরে তার পরিবার সচ্ছল হয়ে উঠবে। এক পরিবার সচ্ছল হলে তার প্রভাব আশপাশের পরিবারগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, পরিবারভিত্তিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হবে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার গ্রামে এবং ৩০ শতাংশ পরিবার শহরে বসবাস করে এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে প্রথমে গ্রামাঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি শহরের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকাতেও কর্মসূচি চালু করা হবে।
তিনি জানান, প্রতিটি পরিবারের গৃহকর্ত্রী অর্থাৎ মা বা গৃহিণীর হাতেই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। কার্ডে তার নাম, একটি নির্দিষ্ট নম্বর, মেয়াদ এবং স্ক্যানিং সুবিধা থাকবে। যদিও একবারে চার কোটি পরিবারকে কার্ড দেওয়া সম্ভব হবে না, তবে ধাপে ধাপে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা জানান তিনি।
তারেক রহমান আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ড একজন কৃষকের স্ত্রী যেমন পাবেন, তেমনি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের স্ত্রীও পাবেন। গ্রামীণ ভ্যানচালকের স্ত্রী থেকে শুরু করে একজন ইউএনও, ডিসি বা এসপির স্ত্রী, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর স্ত্রীও এই কার্ডের আওতায় থাকবেন।
তবে যাদের প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন নেই, তারা স্বেচ্ছায় কার্ড ফিরিয়ে দেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এতে করে সেই কার্ড প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে পডকাস্ট অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে এই পডকাস্টের মাধ্যমে তারেক রহমান সরাসরি দেশের মানুষের সামনে তার চিন্তা-ভাবনা, দর্শন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। তার মতে, জনগণ আর অবাস্তব ও ফাঁকা আশ্বাস শুনতে চায় না; তারা চায় স্পষ্ট অঙ্গীকার ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব।
তিনি জানান, ধারাবাহিকভাবে পডকাস্টের মাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ড কর্মসূচি, পরিবেশ সুরক্ষা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা, ক্রীড়া ও যুব উন্নয়ন পরিকল্পনাও গুরুত্ব পাবে।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি পরিবার আর্থিক, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার ন্যায্য অধিকার পাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।































