ইসরায়েল-মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা থামবে না: ইরান
Published : ২৩:৪৪, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনিবারের সূর্যোদয় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আলো নয়, বরং বারুদের গন্ধ আর মৃত্যুসংবাদ বয়ে এনেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা টানটান উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান’ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ইরানের ভূখণ্ডে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ এই সামরিক হামলায় কেবল কৌশলগত ও সামরিক স্থাপনাই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এবং শিশুদের স্বপ্নও বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে এই হামলার জবাবে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ-কে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৪টি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু দেশে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ঘাঁটি থাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা একটি নির্দিষ্ট স্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত একাধিক ঘাঁটি টার্গেট করা হয়েছে।
ঐ সূত্রের দাবি, ইরানের ধারাবাহিক আক্রমণে মোট ১৪টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শনিবার সকালে ঘোষণা করেছে, তাদের নৌবাহিনীর নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এমএসটি’ নামের একটি কমব্যাট সাপোর্ট ওয়ারশিপ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জানানো হয়, চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য নৌ-সম্পদও আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতায় রয়েছে।
ইরানের খতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে অধিকৃত অঞ্চলসমূহ এবং অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শত্রুর চূড়ান্ত পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান থামবে না। পাশাপাশি তিনি জানান, পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি, সম্পদ ও স্বার্থ এখন থেকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি আশ্বাস দেন, সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ দৃঢ়তায় দেশ, জাতি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে।
এই ভয়াবহ সংঘাতের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে দক্ষিণ ইরানের হরমোজান প্রদেশের মিনাব শহরে। একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত পাঁচজন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। বই-খাতা আর রঙিন পোশাক নিয়ে স্কুলে যাওয়া নিষ্পাপ শিশুদের নিথর দেহ আধুনিক যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। শোকাহত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, শিশুদের এই রক্ত বৃথা যাবে না।
এদিকে ইরানের রাজধানী তেহরান-এর বাসিন্দাদের শহর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদ। যে শহর প্রতিদিন জীবনের ব্যস্ততায় মুখর থাকে, সেখানে এখন সাইরেনের শব্দ আর অনিশ্চয়তার ছায়া। নাগরিকদের দ্রুত অন্যত্র সরে যাওয়ার এই আহ্বান মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টিরও বেশি প্রদেশ হামলার শিকার হয়েছে। বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠেছে বহু জনপদ। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত ব্যাপক যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাল্টা জবাবে আইআরজিসি ‘অবিরাম অভিযান’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কাতারের আল-উদেইদ এবং কুয়েতের আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে একজন বেসামরিক ব্যক্তির প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে এবং দুবাইয়ের পাম আইল্যান্ড এলাকায় আগুনের ধোঁয়া দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এমনকি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি।
ধ্বংসযজ্ঞের এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ-এর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট—এই আগ্রাসনের জন্য শত্রুপক্ষকে অনুতপ্ত হতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে আর যুদ্ধের শব্দ ক্রমশ প্রবল হচ্ছে। স্কুলগামী শিশু থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরছাড়া সাধারণ মানুষ—সকলেই যেন বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডের গুটি।
এই সংঘাত কেবল মানচিত্রের সীমানা নয়, মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। বিশ্ব রুদ্ধশ্বাসে পর্যবেক্ষণ করছে—এই আগুনের বিস্তার কি আরও বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস বহন করছে?
বিডি/এএন




























