ইরানের স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় নিহত শিক্ষার্থী বেড়ে ৮৫

ইরানের স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় নিহত শিক্ষার্থী বেড়ে ৮৫ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০২:০৩, ১ মার্চ ২০২৬

পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে দীর্ঘদিনের আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পর ইরানের ওপর আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে শুরু হওয়া যৌথ এই সামরিক অভিযানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টিরও বেশি প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

হামলায় বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর কার্যালয় এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর বাসভবন। এছাড়া দেশটির মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বাসস্থান, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

শুধু রাষ্ট্রীয় বা সামরিক স্থাপনা নয়, বেসামরিক অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮৫ জনে পৌঁছেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। নিহত শিক্ষার্থীদের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হামলাটি চালানো হয়। তখন স্কুলটিতে প্রায় ১৭০ জন ছাত্রী উপস্থিত ছিল। হামলার পর বহু শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানে হামলার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও বার্তায় জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘বড় ধরনের যুদ্ধাভিযান’ পরিচালনা করেছে। তিনি বলেন, আমরা বহুবার একটি চুক্তির চেষ্টা করেছি, আলোচনা চেয়েছি। কিন্তু এখন আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করব এবং ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে দেব। সবকিছু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হবে।

ইরানে চলমান এই সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে। বেইজিং সব পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমিত করে পুনরায় সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এক বিবৃতিতে বলেছে, পরিস্থিতিকে দ্রুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরিয়ে নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, এই সামরিক আগ্রাসন পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এসব ‘দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডের’ নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা। রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক সম্মান এবং স্বার্থের ভারসাম্যের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানানো হয়েছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ-ও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, সামরিক অভিযান চালানোর আগে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক আলোচনা ছিল কেবল একটি আড়াল। তার ভাষায়, শান্তির দূতের মুখোশের আড়ালে প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সামরিক পদক্ষেপ; বাস্তবে কেউ সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়নি।

এদিকে পাল্টা জবাব দিতে পিছিয়ে নেই ইরান। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালানো হচ্ছে। ইরানি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

ইরানের পাল্টা হামলা শুরুর পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, ইরান থেকে ছোড়া অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় শনাক্ত হয়েছে। দেশজুড়ে বিপদ সংকেত সাইরেন বেজে উঠেছে এবং নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইডিএফের জরুরি সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বড় ঢেউ ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমান বাহিনী সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। তবে তারা স্বীকার করেছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নিখুঁত নয়; তাই সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে জনগণকে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তেল আবিবসহ প্রধান শহরগুলোতে সাইরেন ও বিস্ফোরণের শব্দ পরিস্থিতির ভয়াবহতা বাড়িয়ে তুলেছে।

ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের এমএসটি যুদ্ধজাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি অস্বীকার করেছে। আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, শত্রুর চূড়ান্ত পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং সামনে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে।

কড়া বার্তা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ইরানে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব স্থাপনা এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’। যেসব স্থান থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি অভিযান পরিচালিত হয়েছে কিংবা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোকে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement