যেভাবে খামেনির নিখুঁত অবস্থান বের করল সিআইএ ও ইসরায়েল

যেভাবে খামেনির নিখুঁত অবস্থান বের করল সিআইএ ও ইসরায়েল ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৪:৫৮, ১ মার্চ ২০২৬

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে নিবিড় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় হয়েছিল বলে জানা গেছে। অভিযান সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ইরানে হামলার প্রস্তুতির ঠিক আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে পায়। সংস্থাটি কয়েক মাস ধরেই আয়াতুল্লাহ খামেনির অবস্থান ও চলাফেরার ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অবস্থান, রুটিন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে আরও স্পষ্ট ও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সিআইএ জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে এবং সেখানে খামেনিও উপস্থিত থাকবেন।

এই তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার নির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন গোয়েন্দা তথ্যকে কাজে লাগাতেই হামলার সময় বদলানো হয়।

এই তথ্য দুই দেশের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সুযোগ তৈরি করে দেয়। তারা ধারণা করে, এতে দ্রুত বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে—বিশেষ করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করে আঘাত হানা এবং সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে।

খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয়, হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ছিল। বিশেষত গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের পর তারা ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো সম্পর্কে গভীর ও বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছিল।

এ ঘটনাটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রস্তুতির স্পষ্ট সংকেত থাকা সত্ত্বেও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেনি।

সূত্রগুলোর দাবি, খামেনির অবস্থান সম্পর্কে ইসরায়েলকে অত্যন্ত নির্ভুল ও নির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করে সিআইএ।

বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক ও গোয়েন্দা ইস্যু হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তথ্য এবং নিজেদের গোয়েন্দা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে ইসরায়েল কয়েক মাস ধরে এই হামলার পরিকল্পনা করে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্দিষ্টভাবে টার্গেট করা।

প্রাথমিকভাবে রাতের অন্ধকারে হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শনিবার সকালে উল্লিখিত কমপ্লেক্সে বৈঠকের তথ্য পাওয়ার পর হামলার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল এমন একটি কমপ্লেক্সে, যেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট, সর্বোচ্চ নেতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয় অবস্থিত।

ইসরায়েলের ধারণা ছিল, সেখানে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান অ্যাডমিরাল আলী শামখানি, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি, উপগোয়েন্দামন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজি এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন।

অভিযান শুরু হয় ইসরায়েল সময় ভোর ৬টার দিকে। সে সময় যুদ্ধবিমানগুলো ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। বিমানসংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও সেগুলোতে ছিল দূরপাল্লার এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র।

উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর, তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নির্ধারিত কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। হামলার সময় কমপ্লেক্সের একটি ভবনে জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন, আর খামেনি ছিলেন পাশের আরেকটি ভবনে।

ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এক বার্তায় জানান, সেদিন সকালে তেহরানের একাধিক স্থানে সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলা ছিল সেই কমপ্লেক্সে, যেখানে ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের শীর্ষ ব্যক্তিরা জড়ো হয়েছিলেন।

তিনি আরও দাবি করেন, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও এই অভিযানে ইসরায়েল কৌশলগতভাবে চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও সিআইএ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা নিশ্চিত করে যে, শনিবারের হামলায় রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানি এবং মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। এর আগে ইসরায়েল তাদের হত্যার দাবি করেছিল।

অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি এবং কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতার ফলাফল।

গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে খামেনি কোথায় অবস্থান করছেন এবং চাইলে তাকে হত্যা করা সম্ভব।

সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সে সময় যে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছিল, সাম্প্রতিক অভিযানে একই নেটওয়ার্কের তথ্য কাজে লাগানো হয়েছে।

এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা তথ্যভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে খামেনি ও আইআরজিসি কীভাবে যোগাযোগ ও চলাচল করছিল—সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই খামেনির গতিবিধি অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছে।

এ ছাড়া ইরানের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অবস্থান সম্পর্কেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে। নেতৃত্ব অবস্থান করা কমপ্লেক্সে হামলার পর পরবর্তী ধাপে যেসব স্থানে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ছিলেন, সেসব স্থানেও আঘাত হানা হয়।

তবে ইরানের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্থান পরিবর্তন করে সরে যেতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ এই অভিযানে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement