খামেনির মৃত্যুর খবরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বার্তা

খামেনির মৃত্যুর খবরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বার্তা ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০৩:৩০, ১ মার্চ ২০২৬

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর আকস্মিকভাবে ইরানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই তেহরানসহ দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শহরকে লক্ষ্য করে সমন্বিত ও ব্যাপক এই হামলা পরিচালনা করে দুই মিত্র দেশ।

এই অভিযানে বিশেষভাবে নিশানা বানানো হয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকারি বাসভবন।

পাশাপাশি দেশটির একাধিক মন্ত্রী, সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের আবাসস্থল, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতেও আঘাত হানা হয়।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, এসব হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ ও বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে পৃথক এক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহত হয়েছেন।

তবে ইসরায়েলি সূত্রগুলোর এমন দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার জানা অনুযায়ী সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি জীবিত আছেন।

যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে হামলায় দুইজন কমান্ডার প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এটিকে বড় ধরনের ক্ষতি হিসেবে দেখছেন না বলে উল্লেখ করে আরাগচি বলেন, সম্ভবত এক বা দুইজন কমান্ডারকে তারা হারিয়েছেন, কিন্তু এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তার ভাষায়, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সবাই নিরাপদে আছেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে রয়েছেন এবং পরিস্থিতি তারা সামাল দিচ্ছেন।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছেন তার নির্বাহী ডেপুটি মোহাম্মদ জাফর কিয়ামফানা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এছাড়া প্রেসিডেন্টের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান টেলিগ্রামে লেখেন, এবারও তাদের বিরুদ্ধে চালানো হত্যাচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

রয়টার্সের খবরে আরও বলা হয়েছে, হামলার একেবারে শুরুতেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তারা হামলার প্রথম দিকেই প্রাণ হারান।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তেহরানে যেসব স্থাপনায় তারা হামলা চালিয়েছে, সেসব জায়গায় জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন।

শুধু সরকারি ও সামরিক স্থাপনাই নয়, হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫১ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারে তায়্যিবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ হামলা চালানো হয়। নিহত শিক্ষার্থীদের বয়স ছিল ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।

হামলার সময় বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১৭০ জন ছাত্রী উপস্থিত ছিল। বিস্ফোরণের পর বহু শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে বলেও জানা গেছে।

ইরানে হামলার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও বার্তায় জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালিয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার একটি চুক্তির চেষ্টা করেছে, আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি সেদিকে অগ্রসর হয়নি। তার ভাষায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করা তাদের লক্ষ্য।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি করেনি ইরানও। তারা তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে।

শুধু ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, ইরান থেকে ছোড়া বহু ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় শনাক্ত করা হয়েছে। পাল্টা হামলার পর পুরো ইসরায়েলজুড়ে সাইরেন বেজে ওঠে এবং নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইডিএফের জরুরি সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি ঢেউ সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমান বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে কাজ করছে।

তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নির্ভুল নয়। তাই প্রাণহানি এড়াতে জনগণকে অবশ্যই নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তেল আবিবসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন প্রধান শহরে একের পর এক সাইরেন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে, যা দেশটিকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শত্রু সম্পূর্ণভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং তারা এই লড়াই থামাবে না।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement