১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কড়া নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কড়া নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৯:১০, ২১ জানুয়ারি ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যেন দেশের কোথাও কোনো ধরনের গলদ বা ত্রুটি না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। জাতির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে নির্বাচনকে উপস্থাপন করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন যেন কোনো ধরনের ঘাটতি বা বিশৃঙ্খলা দেখা না দেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ মনোযোগী থাকতে হবে। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে থাকে, সেই লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে।

ড. ইউনূস আরও বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে প্রস্তুতি ও পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আজ থেকেই সেই প্রক্রিয়া শুরু হলো, আর ১২ ফেব্রুয়ারি হবে চূড়ান্ত দিন। এখন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাই সর্বোচ্চ নির্দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। সবাইকে ইসির নির্দেশনা মেনে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমান্ডের মূল দায়িত্বে থাকবে।

তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে। সে কারণে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব বজায় রেখে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের সঙ্গে প্রচার চালাচ্ছেন। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা যেন শেষ পর্যন্ত এই মনোভাব বজায় রাখেন। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয়হীনতা যেন না থাকে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের নজরে থাকবে। তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাই আমাদের প্রস্তুতিও হতে হবে সমানভাবে সিরিয়াস ও পেশাদার। বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৩০০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এবং দুজন প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।

ইসি সচিব আরও জানান, বুধবার মধ্যরাত থেকে শুরু করে ১০ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে সাতটা পর্যন্ত প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন। তিনি বলেন, সাইবার জগতে অপতথ্য ও তথ্য বিকৃতি এবারের নির্বাচনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট এবং পোস্টাল ব্যালট গণনায় কিছুটা বাড়তি সময় লাগতে পারে। এ নিয়ে যেন কোনো গুজব বা বিভ্রান্তি না ছড়ায়, সে বিষয়ে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা মোট লুট হওয়া অস্ত্রের ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে লুট হওয়া ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার হয়েছে, যা প্রায় ৫২ শতাংশ।

সেনাপ্রধান বলেন, নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জাতিকে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করবেন। ফলে কোনো প্রার্থী বা পক্ষ ইচ্ছামতো অন্য প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে পারবে না। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কোনো ধরনের বেআইনি কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এবারের নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনে তারা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement