কীভাবে দলের কেন্দ্রবিন্দুতে এলেন তারেক রহমান

কীভাবে দলের কেন্দ্রবিন্দুতে এলেন তারেক রহমান ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৪:২০, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে এটিই হতে যাচ্ছে তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় জাতীয় নির্বাচনি অভিষেক।

নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে মায়ের মৃত্যুজনিত শোকের মধ্যেই বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। এরপর থেকে তার নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনি প্রচারণা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিএনপি তাকে সামনে এনে ‘একক নেতা’ হিসেবেই উপস্থাপন করছে।

তারেক রহমানকে ঘিরে শুধু বিএনপি সমর্থকদের মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচনা চলছে। একাধিক আন্তর্জাতিক মিডিয়া তাকে বাংলাদেশের ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেও আখ্যায়িত করছে।

প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ঢাকায় ফেরার পর দলের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা। এর মধ্য দিয়েই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত দলটি আবারও দীর্ঘ সংকটকাল পার হয়ে বড় ছেলে তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আসা ছিল প্রায় অনিবার্য। তবে তার একক নেতৃত্বের প্রথম বড় পরীক্ষা হচ্ছে এবারের নির্বাচন। এই নির্বাচনের ফলাফলই মূলত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপিকে সংগঠিত ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তারেক রহমান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। তবে অতীতের নানা বিতর্ক ও সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে তিনি কীভাবে নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দল পরিচালনা করেন, সেদিকেই এখন সবার নজর।

যদিও এই নির্বাচনে নেই বিএনপির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে এবার বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে একসময়কার রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। প্রায় আঠারো মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে যান তিনি।

গত ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এর মাত্র কয়েকদিন পর ৩০ ডিসেম্বর তিনি হারান তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। এরপর চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হন।

এর আগে ২০১৮ সাল থেকেই লন্ডনে অবস্থান করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি। আরও আগে, ২০০২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। পরে ২০০৯ সালের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই কার্যত বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়ে আসছিল। তাই চেয়ারম্যান পদে তার আসা ছিল সময়ের স্বাভাবিক পরিণতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিদেশে থেকেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা তারেক রহমানের বড় সাফল্য। তিনি সবসময় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিলেন। দেশে ফেরার পর তাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত মনে হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে তার সিদ্ধান্তে সেই পরিণতির প্রতিফলন কতটা দেখা যায়।

তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। বিএনপির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন।

তবে সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন কি না—সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নির্বাচনী হলফনামায় তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে ‘উচ্চ মাধ্যমিক’।

দলের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের পরিবারের সঙ্গে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমানও বন্দি ছিলেন। পরবর্তীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন তারেক রহমান এবং ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির রাজনীতিতে তার শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। ওই নির্বাচনে চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এরপর ২০০২ সালে নতুন করে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ সৃষ্টি করে তাকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়—যা তার রাজনৈতিক জীবনের বড় উল্লম্ফন হিসেবে বিবেচিত।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। রিমান্ডে নেওয়ার পর তিনি চরম নির্যাতনের শিকার হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, এই নির্যাতনের উদ্দেশ্য ছিল খালেদা জিয়াকে দেশত্যাগে বাধ্য করা।

শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পরিবারসহ লন্ডনে চলে যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর সেখানে অবস্থানের পর গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি।

এই দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বিএনপি এখন তাকে একক নেতা হিসেবে সামনে আনছে এবং তার একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য, তারেক রহমান যেন ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মধ্যপন্থী গণতন্ত্রের’ প্রতীকী নেতা হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপিত হতে পারেন।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement