পরিবারের সদস্যদের মাতৃভাষা, বাইরে বাংলা, চারটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষা হুমকির মুখে

পরিবারের সদস্যদের মাতৃভাষা, বাইরে বাংলা, চারটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষা হুমকির মুখে ছবি: সংগৃহীত

রংপুর প্রতিনিধি

Published : ১৯:২৭, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবার আগে রাজাবিরাট কিংবা তল্লাপাড়ার কোনো সাঁওতালপাড়ায় ঢুকলে ভেসে আসে আলাদা এক সুর-মায়ের মুখে সন্তানের সঙ্গে কথোপকথন, উঠানে বসে বয়োজ্যেষ্ঠদের গল্প কিংবা গির্জার প্রার্থনার আগে নীরব প্রস্তুতি।

কিন্তু সেই সুর ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ভাষা মুখে আছে, কাগজে নেই; বই নেই, নিজস্ব ভাষায় স্কুল পাঠক্রম নেই, নেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে গাইবান্ধার চার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করছে সাঁওতাল, ওরাওঁ, মাহালি ও মালপাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ। সংখ্যা ছয় থেকে সাত হাজারের মতো। রাজাবিরাট, জয়পুর, মাদারপুর, তুলট, তল্লাপাড়া এমন বহু গ্রামেই তাদের বসতি। সমতলের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় বসবাস করলেও তাদের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, উৎসব ও ধর্মীয় ঐতিহ্য এখনও আলাদা বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত।

কিন্তু সেই বৈচিত্র্যই এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সাঁওতালদের ‘সারি’ বা সাঁওতালি ভাষা, ওরাওঁদের ‘কুরুক’ ও ‘সাদরি’ এ অঞ্চলে প্রচলিত প্রধান মাতৃভাষা। এসব ভাষার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকেন্দ্র নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজস্ব বর্ণমালা অনুপস্থিত বা প্রচলিত নয়। ফলে ভাষাগুলো কেবল মুখে মুখেই টিকে আছে। বাংলা বা ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে মাতৃভাষা থেকে।

ফুলপুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী রূপসী মার্ডি বলেন, বাড়িতে তারা সাঁওতালি ভাষায় কথা বলে, কিন্তু স্কুলে বাংলা ছাড়া উপায় নেই। আদরী সরেন বা স্বপ্না হাসদারাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানায়। বাংলা বা ইংরেজি হরফে কিছু ধর্মীয় বই থাকলেও নিজেদের ভাষার নিজস্ব হরফে পাঠ্যপুস্তক নেই বললেই চলে।

মোতালেবনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রশান্ত মুর্মু, আকাশ কিসকুদের কথায়ও উঠে আসে একই বাস্তবতা ‘বাড়িতে মাতৃভাষা, বাইরে বাংলা।’ তল্লাপাড়ার সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট প্রি-সেমিনারি মিশন স্কুলের শিক্ষিকা দিপালী কিস্কু বলেন, ‘কথ্যভাষা হিসেবে সাঁওতালি বা ওরাওঁ ভাষা আছে, কিন্তু তা লিখিত রূপ না পেলে টিকে থাকবে না।’

ধর্ম ও শিক্ষা বিষয়ে মহিপুর সার্কেলের ডিস্ট্রিক্ট পাস্টর জেমস সরেনের কণ্ঠে শোনা যায় শঙ্কা ‘আমি বলতে পারছি, কিন্তু আমার সন্তানরা হয়তো আর পারবে না।’ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই মিশনারিদের প্রভাবে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটে। প্রকৃতিপূজারি জীবনধারা থেকে অনেকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন, অনেকে সনাতন ধর্মে আছেন। শিক্ষার হার বেড়েছে, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছে বহু তরুণ-তরুণী।

মিশনারি ও সমাজসেবক এমিলি হেমব্রম বলেন, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট ও দিনাজপুর অঞ্চলে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ এখন শিক্ষিত ও কর্মজীবী। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ও সামাজিক পরিসরে তাদের বাংলা বা ইংরেজিতে কথা বলতে হয়। ফলে মাতৃভাষা সীমিত হয়ে পড়ছে পারিবারিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে।

দইহাড়া গ্রামের আবিনা টপ্পো বলেন, ‘মাতৃভাষা এখন শুধু ঘরের মধ্যে। বাইরে গেলে সবাই বাংলা বলে।’ ওরাওঁ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরু সুশীল টপ্পো বলেন, ‘কুরুক’ ও ‘সাদরি’ ভাষায় সম্প্রতি কিছু বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। ‘নিজস্ব বর্ণমালায় বই ও পাঠদানের ব্যবস্থা না হলে ভাষা রক্ষা সম্ভব নয়’।

আদিবাসী নেতা ডা. ফিলিমন বাস্কে মনে করেন, আধুনিকতার প্রভাবে পোশাক-আচরণ বদলেছে, জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত দুর্বল হয়েছে। আদিবাসী অধিকারকর্মী সুচিত্রা মুর্মু অভিযোগ করেন বলেন, ‘স্বীকৃতি, বর্ণমালা, বই ও শিক্ষক না থাকায় আমাদের সন্তানরা বাংলা শিক্ষায় বড় হয়ে বাঙালি পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। এতে আমাদের নিজস্ব পরিচয় ক্ষয়ে যাচ্ছে।’

গোবিন্দগঞ্জে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘অবলম্বন’ এর নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সূচকে অগ্রগতি দৃশ্যমান। এখন প্রয়োজন মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা, নিজস্ব ভাষায় বই প্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্র গড়ে তোলা। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া তা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হলে শিশুদের শেখার গতি বাড়ে, ঝরেপড়ার হার কমে এবং আত্মপরিচয়ের বোধ জোরদার হয়। কিন্তু গাইবান্ধার এই চার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটিতে তাই সন্ধ্যার সেই সাঁওতালি সুর এখনো ভেসে আসে, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

বইয়ের পাতায় জায়গা না পেলে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না মিললে, হয়তো আগামী প্রজন্মের কণ্ঠে আর শোনা যাবে না ‘সারি’, ‘কুরুক’ কিংবা ‘সাদরি’র সুর। ভাষা হারালে হারাবে ইতিহাস, স্মৃতি আর একটি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়। সেই হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ রাষ্ট্রের, সমাজের এবং সম্প্রদায়ের নিজস্ব সচেতনতার।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement