রমজান মাসে সারাদিন সিয়াম সাধনার পর ইফতারের মুহূর্তটি সবার কাছেই প্রশান্তি ও স্বস্তির। তবে অনেকেই খেয়াল করেন, ইফতারের কিছু সময় পর মাথাব্যথা শুরু হয়।
কারও ক্ষেত্রে এটি হালকা চাপধরা ব্যথা, আবার কারও ক্ষেত্রে তীব্র মাইগ্রেনের মতো ধকধকে যন্ত্রণা দেখা দেয়। কেন এমন হয়, এবং কীভাবে এ সমস্যা এড়ানো বা কমানো যায়—এ বিষয়গুলো নিয়েই আজকের আলোচনা।
ইফতারের পর মাথাব্যথা কেন হয়—এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। নিচে প্রধান কারণগুলো ব্যাখ্যা করা হলো।
১. দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার প্রভাব (রক্তে শর্করা কমে যাওয়া)
রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ না খাওয়ার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে। ইফতারের আগ মুহূর্তে অনেকেই দুর্বলতা, মাথা ঝিমঝিম করা বা মাথা ঘোরা অনুভব করেন। এরপর হঠাৎ বেশি পরিমাণে খাবার খেলে শরীরে রক্তসঞ্চালন ও হরমোনের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। এই আকস্মিক পরিবর্তন মাথাব্যথার সূত্রপাত করতে পারে।
বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা যাদের খাদ্যাভ্যাস অনিয়মিত, তাদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
২. পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)
সারাদিন পানি পান না করার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা মাথাব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ। ইফতারের সময় পর্যাপ্ত পানি না খেয়ে যদি ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া হয়, তাহলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বেশি।
৩. অতিরিক্ত ও ভারী খাবার গ্রহণ
ইফতারে অনেকেই তেল-চর্বিযুক্ত, ভাজাপোড়া ও মশলাদার খাবার বেশি খান। হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে পরিপাকতন্ত্রে চাপ পড়ে। তখন শরীরের রক্তের একটি বড় অংশ হজম প্রক্রিয়ায় কাজ করতে যায়, ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। এতে মাথাব্যথা অনুভূত হতে পারে।
অতিরিক্ত মিষ্টি বা কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার রক্তে শর্করার দ্রুত ওঠানামা ঘটিয়ে মাথাব্যথা সৃষ্টি করতে পারে।
৪. ক্যাফেইন গ্রহণে বিরতি
যারা নিয়মিত চা বা কফি পান করেন, রোজার সময় দিনের বেলায় তা না খাওয়ার কারণে শরীরে ক্যাফেইনের ঘাটতি দেখা দেয়। একে ক্যাফেইন প্রত্যাহারজনিত মাথাব্যথা বলা হয়। ইফতারের সময় চা বা কফি পান করলেও অনেক সময় সারাদিনের ঘাটতির কারণে মাথাব্যথা পুরোপুরি সারে না।
৫. ঘুমের অনিয়ম
রমজানে সেহরি, তারাবি ও রাতের ইবাদতের কারণে ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তিত হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা ঘুমের অনিয়ম মাথাব্যথার বড় কারণ। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই মাইগ্রেনে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি প্রকট হতে পারে।
৬. উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য শারীরিক কারণ
কিছু ক্ষেত্রে ইফতারের পর মাথাব্যথা উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ হতে পারে। সাইনাসের সমস্যা, চোখের পাওয়ার পরিবর্তন কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপও এ সমস্যার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। যদি মাথাব্যথা নিয়মিত, তীব্র বা অস্বাভাবিক হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
মাইগ্রেন রোগী
ডায়াবেটিস রোগী
উচ্চ রক্তচাপের রোগী
নিয়মিত চা-কফি পানকারী
যাদের ঘুমের অভ্যাস অনিয়মিত
যারা ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খান
প্রতিকার ও করণীয়
১. ধীরে ও পরিমিত ইফতার
ইফতার শুরু করুন পানি ও খেজুর দিয়ে। এরপর হালকা খাবার গ্রহণ করুন। একবারে অতিরিক্ত না খেয়ে ধীরে ধীরে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে রক্তে শর্করার হঠাৎ পরিবর্তন কম হবে এবং হজমে চাপও কম পড়বে।
২. পর্যাপ্ত পানি পান
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। সাধারণভাবে ৮–১০ গ্লাস পানি পান করার লক্ষ্য রাখতে পারেন। তবে একসঙ্গে বেশি পানি না খেয়ে সময় ভাগ করে পান করা উত্তম।
লেবুর শরবত, ডাবের পানি বা প্রাকৃতিক ফলের রস উপকারী হতে পারে, তবে অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলাই ভালো।
৩. ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত মিষ্টি সীমিত রাখুন
পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপির মতো খাবার জনপ্রিয় হলেও এগুলো পরিমিত খান। পরিবর্তে ফল, সালাদ, ছোলা, স্যুপ ও হালকা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করুন। এতে শক্তি বজায় থাকবে, কিন্তু মাথাব্যথার ঝুঁকি কমবে।
৪. ক্যাফেইন ধীরে কমান
রমজানের আগে থেকেই চা-কফির পরিমাণ ধীরে কমানো ভালো। এতে রোজার সময় ক্যাফেইন প্রত্যাহারজনিত সমস্যা কম হবে। ইফতারের পরও অতিরিক্ত কফি পান না করে সীমিত রাখুন।
৫. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
প্রতিদিন অন্তত ৬–৭ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। সেহরির পর কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম মাথাব্যথা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৬. হালকা ব্যায়াম ও বিশ্রাম
ইফতারের পর অল্প সময় হাঁটাহাঁটি করলে হজম ভালো হয় এবং রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। মাথাব্যথা শুরু হলে শান্ত ও অন্ধকার পরিবেশে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন।
৭. প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ
যদি মাথাব্যথা খুব তীব্র হয়, বমি, ঝাপসা দেখা বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন।
ঘরোয়া কিছু সহজ উপায়
কপালে ঠান্ডা পানির কাপড় রাখা
হালকা গরম চা পান (পরিমিত)
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম
হালকা মাথা বা কাঁধে ম্যাসাজ
এসব উপায় অনেক সময় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।
ইফতারের পর মাথাব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও এটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ঘুম ও সংযমী জীবনযাপন এই সমস্যাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
রমজান সংযমের মাস—খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনে সংযম বজায় রাখতে পারলে শরীর থাকবে সুস্থ এবং ইবাদত হবে প্রশান্তিময়। নিয়মিত বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাসই পারে ইফতারের সময়টুকুকে স্বস্তিদায়ক রাখতে।


































