রংপুরে ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা সাত বছরেও চালু হয়নি
Published : ২২:০৯, ১৫ মার্চ ২০২৬
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার আসে সরকার যায়। রাজনৈতিক দলের নেতার প্রতিশ্রুতির ঘাটতি না থাকলেও উন্নয়ন বৈষম্যের ফাঁদ থেকে মুক্তি মিলছে না রংপুরবাসীর।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে রংপুরে প্রথম পাক বাহিনীর সাথে তীর ধনুক নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সাধারণ মানুষ। চব্বিশের ছাত্র জনতার আন্দোলনে দেশের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।
দেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে রংপুরের মানুষ রক্ত দিতে দ্বিধা বোধ না করলেও সেই রংপুরের সুসষম উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি কোন রাজনৈতিক দল বা সরকার। দীর্ঘ আন্দোলনের পর রংপুরে ১০০ শয্যার বিশেষায়িত একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে।
কিন্তু সেখানে পূর্ণাঙ্গ সেবা কার্যক্রম শুরু হয়নি ৭ বছরেও! জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এটি বৈষম্য নাকি রংপুরের প্রতি অবহেলা? বর্তমানে রংপুর শিশু হাসপাতাল এখনো পড়ে আছে অচলাবস্থায়। পতিত হাসিনা সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আড়াই বছর আগে ফিতা কেটে হাসপাতালের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন ঠিকই কিন্তু সেবার দ্বার এখনো খোলা হয়নি।
কবে খুলবে সেবার দুয়ার, কে দেখাবে পথ,এমন প্রশ্ন রংপুরের মানুষের মুখে মুখে। দীর্ঘসময় ধরে অব্যবহৃত থাকায় হাসপাতালটির দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোজুড়ে এখন ভুতুড়ে পরিবেশ। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকায় বাড়ির অন্যান্য সামগ্রীও ক্রমান্বয়ে নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এখনো আলোর মুখ দেখল না হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা। দেখলে অনুধাবন করা যায়, ১০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনটি যেন নির্জন এক ভূতের বাড়ি।
সেখানে সর্বত্র সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে সীমিত পরিসরে শিশু বহির্বিভাগের কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে সেখানেও রোগী বা স্বজনের আনাগোনা তেমন একটা নেই। হাসপাতাল চত্ত্বরে শিশুদের জন্য নির্মিত খেলাধুলার রাইডগুলো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেগুলোতে জমেছে ধুলো-ময়লা।
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার নাজুক অবস্থা চলছে। রংপুর বিভাগের প্রায় ২ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার এই প্রতিষ্ঠানটি এখন আস্থাহীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে হাসপাতালটিতে জনবল সংকট থাকায় শিশু বিভাগে চাহিদামতো বিশেষজ্ঞদের দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিভাগীয় নগরীর রংপুরে একটি বিশেষায়িত পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন করেছিল সাধারন মানুষ। আওয়ামী লীগ সরকার ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালের ভরন নির্মাণ করেছে। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছরেও চিকিৎসাসেবা শুরু না হওয়ায় এখন সাধারণ মানুষ হতাশ।
রংপুরের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রংপুরের সাবেক সদর হাসপাতালের ১ দশমিক ৭৮ একর জমির মধ্যে শিশু হাসপাতাল নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর। ৩১ কোটি ৪৮ লক্ষ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকার সেই কাজটি করেছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মল্লিক এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স অণিক ট্রেডিং কর্পোরেশন।
ভবন নির্মাণের জন্য দুই বছরের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের আড়াই মাস আগে কাজ শেষ করা হয়। তিনতলা মূল হাসপাতাল ভবনের প্রতি তলার আয়তন ২০ হাজার ৮৮২ দশমিক ৯৭ বর্গফুট। এছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে চারতলা ভিত্তির তিনতলা সুপারিনটেনডেন্ট কোয়ার্টার।
সিঁড়ি বাদে প্রতি তলার আয়তন দেড় হাজার বর্গফুট। ছয়তলা ডক্টরস কোয়ার্টারের নিচতলায় গাড়ি পার্কিং, দ্বিতীয় তলা থেকে ডাবল ইউনিট। আছে ছয়তলা বিশিষ্ট স্টাফ অ্যান্ড নার্স কোয়ার্টার।
দুইতলা বিশিষ্ট গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার। নিচে দুটি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। বিদ্যুৎ সাবস্টেশন স্থাপনের জন্যও নির্মাণ করা হয়েছে একটি ভবন। শিশু হাসপাতালের মূল ভবনের প্রথম তলায় ইমার্জেন্সি, আউটডোর, চিকিৎসকদের চেম্বার এবং ল্যাব। দ্বিতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার, ব্রোন ইউনিট এবং তৃতীয় তলায় ওয়ার্ড এবং কেবিন।
নবনির্মিত এই হাসপাতাল ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা সিভিল সার্জনকে ২০২০ সালের ৮ মার্চ হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু ওই বছর করোনা প্রাদুর্ভাব বাড়ায় ভবনটিকে ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখন সেখানে করোনা রোগী নেই।
হাসপাতালটি চালু হলে শিশুদের জটিল সার্জারিসহ সাধারণ সব রোগের চিকিৎসা স্বল্পমূল্যে দেওয়া যাবে এবং ভোগান্তি কমে আসবে বলে মনে করেন মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল নির্মাণের জন্য রংপুরের মানুষ আন্দোলন করেছে। বিভিন্ন সময়ে এই দাবিটি সরকারের নজরে আনতে আমরা চেষ্টা করেছি।
আওয়ামী লীগ সরকার সেই দাবি পূরণে সদর হাসপাতালের জমিতে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করেছে। কিন্তু ভবন হস্তান্তরের পর থেকে এখনো সেখানে শিশুদের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু করা তো দূরের কথা, লোকবলই নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এটি এখানকার স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতা।
নগরীর সচেতন মানুষ বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের কাছেও হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু ড. ইউনূসের সরকারও কথা দিয়ে কথা রাখেনি। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছেন।
সরকারি পরিত্যক্ত ভবনগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র করার চিন্তাভাবনা করছেন। অথচ নতুন একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল দীর্ঘ বছর ধরে জনবলের অভাবে পড়ে আছে। এটি উত্তরাঞ্চলের শিশুদের চিকিৎসাসেবার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু এখন সেটি ভুতুরে ভবনে পরিণত হয়েছে। সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া, দ্রুত শিশু হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ সেবা কার্যক্রম শুরু করা হোক।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, এভাবে বছরের পর বছর যদি শিশু হাসপাতালটি পড়ে থাকে, তাহলে একসময় তো এটা পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালু এখন সময়ের দাবি।
অন্তর্বর্তীকালিন সরকার কথা দিয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিএনপি সরকারের কাছে আমাদের দাবি, শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবেন। তিনি আরও বলেন, রহস্যজনকভাবে দীর্ঘ সাত বছর ধরে শিশু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হয়নি।
ফলে রংপুর অঞ্চলের শিশুদের জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য ঢাকাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছুটতে হচ্ছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সীমিত পরিসরে বর্তমানে এ অঞ্চলের শিশুদের চিকিৎসাসেবায় প্রয়োজনীয় জনবলসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। এ কারণে এখানে শিশুদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে না।
দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা রংপুর অঞ্চলের অসহায় মানুষের সন্তানদের কম খরচে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে শিশু হাসপাতালটি চালু করা এখন অতীব জরুরি। রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে কর্মরত শিশু চিকিৎসক ডা. মো. মাহফুজার রহমান বাঁধন বলেন, রমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগ দিয়ে এ অঞ্চলের সব শিশুর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। এটি চালু হলে শিশুদের জটিল সার্জারি ও সাধারণ রোগের চিকিৎসা স্বল্পমূল্যে প্রদান করা সম্ভব হবে। শিশুদের চিকিৎসায় অভিভাবকদের আর্থিক খরচ ও ভোগান্তি কমবে। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য ঢাকা অথবা পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়ার প্রবণতাও অনেকাংশে কমে আসবে।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো, অনুমোদন এবং অর্থ বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে রংপুর অঞ্চলের শিশুরা প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। রংপুর শিশু হাসপাতাল চালুর বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে এটি চালু করার ব্যাপারে কার্যকর কোনো আদেশ এখনও পাওয়া যায়নি।
রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, রংপুরে ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল চালুসহ স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন সমস্যার ব্যাপারে ইতোমধ্যে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন, জনপ্রশাসন বিভাগ কর্তৃক পদ সৃজন এবং অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে অভিহিত করা হয়েছে।
এর প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী এসবের বাস্তব চালচিত্র সম্বলিত একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে অধিদপ্তরে প্রেরণও করা হয়। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকায় ভবনটির অবকাঠামোসহ অন্যান্য সামগ্রী ক্রমান্বয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং জনবল পাওয়া গেলেই এটি চালু করা সম্ভব হবে।
তবে কবে নাগাদ চালু হতে পারে, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. গওছুল আজিম চৌধুরী বলেন, রংপুর শিশু হাসপাতালের পরিচালনার প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ বরাদ্দ এবং অনুমোদনের জন্য চাহিদা নির্ধারণ করে কয়েক মাস পূর্বে মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এখনও কোনো আদেশ পাওয়া যায়নি। তিনি স্বীকার করেন অব্যবহৃত থাকায় অবকাঠামোসহ অন্যান্য সামগ্রী ধুলাবালিতে মলিন হচ্ছে। আশা করছি, শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান হবে।
বিডি/এএন


































