ইরানে একই দিনে দুই ভিন্ন শহরে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত পাঁচজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে। এর কিছু সময় পরই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহভাজেও আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় বিস্ফোরণে চারজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে— গ্যাস লিক থেকেই উভয় বিস্ফোরণের সূত্রপাত। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদার হওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে ওয়াশিংটনের চাপ ও হুমকির প্রেক্ষাপটে একই দিনে দুই শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে বিবিসি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, পারস্য উপসাগর-সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাসে একটি আবাসিক ভবনে বিস্ফোরণের ফলে একজন নিহত হন এবং অন্তত ১৪ জন আহত হন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন এক স্থানীয় কর্মকর্তা, যিনি আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহেরকে এ বিষয়ে জানান। অপরদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহভাজে সংঘটিত বিস্ফোরণে চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র তেহরান টাইমস।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে জানানো হয়, বন্দর আব্বাসের মোআল্লেম বুলেভার্ড এলাকায় অবস্থিত আটতলা একটি আবাসিক ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ভবনের দুটি তলা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি যানবাহন ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের প্রধান মোহাম্মদ আমিন লিয়াকাত জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে— গ্যাস লিক হয়ে জমে থাকা গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণটি ঘটতে পারে। মেহের প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিস্ফোরণের বিস্তারিত কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য জানানো হবে। আঞ্চলিক কর্মকর্তা মেহরদাদ হাসানজাদেহ জানান, আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরাক সীমান্তবর্তী আহভাজ শহরের কিয়ানশাহর এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে। তেহরান টাইমস জানায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বন্দর আব্বাস ইরানের নৌবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এমন একটি সংবেদনশীল এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এদিকে, শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনার সবকিছু মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেও ভাগ করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা সময়ই বলে দেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি এবং জানান, ওই অঞ্চলে একটি বড় মার্কিন নৌবহর মোতায়েন করা হচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, কোনো ধরনের সংঘাতই ইরান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পুরো অঞ্চলের স্বার্থে কল্যাণকর নয়। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই যুদ্ধ চায়নি এবং ভবিষ্যতেও যুদ্ধ চায় না।
এছাড়া শনিবার তেহরানে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বৈঠকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর চলমান প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগের দিন লারিজানি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সম্প্রতি জানিয়েছেন, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তেহরান প্রস্তুত। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো অবস্থাতেই আলোচনার বিষয় হবে না।
































