ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ধারা বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যাতে বলা হয়েছে, মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা হয়েছেন।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কনফারেন্স রুমে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, গত ১৭ মাসে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন এবং ৭ হাজার ৮২ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে ৫৫০টি ঘটনা (৯১.৭ শতাংশ) বিএনপির সঙ্গে, ১২৪টি ঘটনা (২০.৭ শতাংশ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে এবং ৪৬টি ঘটনা (৭.৭ শতাংশ) জামায়াতে ইসলামী দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
টিআইবি জানায়, তফসিল ঘোষণার পরের ৩৬ দিনে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। তুলনামূলকভাবে, ২০২৫ সালে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছিলেন।
এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ রয়েছে, ডিপফেক ও ভুল তথ্য ছড়ানোর ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫০টির বেশি হামলার খবর উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো মেয়াদে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, আন্দোলন, লুটপাট ও অরাজকতা অব্যাহত রয়েছে।
পাশাপাশি থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের কারণে এবং নতুনভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের কারণে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা মোট জনবলের মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে গত তিন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের পরিবর্তন, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংশয় ও মতবিরোধ লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে, ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়। এছাড়া নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ৭৩টি পর্যবেক্ষক সংস্থার মধ্যে অনেকগুলোই ‘নামসর্বস্ব’ বা কার্যক্ষমতা ও সক্ষমতার দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রার্থীর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে হলফনামায় দাখিল করা তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা এবং এর ব্যবহার নিয়েও ঘাটতির বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে নির্বাচন ও গণভোট উভয় ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি, আইন এবং প্রক্রিয়াগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুল বা অপতথ্য ছড়ানোর সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে এগুলো নির্বাচনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
































