জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম সম্পা।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দেওয়া ওই পোস্টে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন—ওসমান হাদির হত্যার বিচার আদৌ হবে কি না। একই সঙ্গে তিনি জানতে চেয়েছেন, এত বড় একটি ঘটনার পরও ইনকিলাব মঞ্চ কেন কোনো কর্মসূচির ডাক দিচ্ছে না।
রাবেয়া ইসলাম সম্পা তার পোস্টে লিখেছেন, ‘বিচার হবে না—এই শব্দটাই আমাদের চিন্তায় আনা যাবে না। বিচার অবশ্যই হতে হবে, যেকোনো মূল্যে। যদি বিচার আদায় না হয়, তাহলে ওসমান হাদির মতো মানুষ, বিপ্লবী বীরেরা এই দেশে আর জন্ম নেবে না।’ একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন, বিচার প্রক্রিয়ায় এত দেরি বা সময়ক্ষেপণ কেন হচ্ছে।
পোস্টে তিনি আরও উল্লেখ করেন, এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ওসমান হাদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি লাইন উদ্ধৃত করেছিলেন—‘সহজ করে বলতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’
সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি লেখেন, তিনি যুক্তি, তর্ক কিংবা ব্যাখ্যার দিকে না গিয়ে শুধু এটুকুই বলতে চান—সবকিছু কেন সহজভাবে হচ্ছে না, তা সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ওসমান হাদি নিজেই বলে গিয়েছিলেন, ‘আমাদের লড়াই অনেক দীর্ঘ। মুমিনের জীবন মানেই লড়াই ও সংগ্রাম।’ তাই এই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হাদির স্ত্রী আরও লেখেন, ইনকিলাব মঞ্চ সম্পর্কে শহীদ ওসমান হাদির নিজের বলা কিছু কথা তিনি সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। তিনি লিখেছিলেন—‘আমার প্রথম সন্তান ইনকিলাব মঞ্চ, দ্বিতীয় সন্তান ফিরনাস। পোলাপানগুলারে বেতন দেই না, ঠিকভাবে খাবারও খেতে পারে না কাজের জন্য। নিঃস্বার্থভাবে আমার সঙ্গে লেগে থাকে। ভবিষ্যতের চিন্তাও ওদের নাই। আমার তো ওদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে হবে ডিয়ার।’
রাবেয়া ইসলাম সম্পা পোস্টে বলেন, যারা শুধু ওসমান হাদির কথা শুনে, ভিডিও দেখে তাকে ভালোবাসেন, তার জন্য দোয়া করেন বা কান্না করেন—তারা যেন একবার ভাবেন, তার রেখে যাওয়া ভাই-বোনদের মানসিক অবস্থা এখন কেমন।
যাদের কাছে ওসমান হাদি ছিল সারাক্ষণ ছায়ার মতো, তারা কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি লেখেন, ওসমান হাদি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো বলতেন—আমাকে নিয়ে কথা বলতে পারেন, কিন্তু আমার ইনকিলাব মঞ্চের ভাই-বোনদের নিয়ে কিছু বলবেন না; কারণ সেটা তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
পোস্টের শেষ অংশে তিনি শহীদ ওসমান হাদির একটি উক্তি উদ্ধৃত করেন—‘দাসত্বই যে জমিনের নিশ্চল নিয়তি, লড়াই-ই সেখানে সর্বোত্তম ইবাদত।’ এরপর লেখেন—শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
উল্লেখ্য, শরিফ ওসমান হাদি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের একজন অগ্রসারির নেতা ছিলেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি সংগঠনের মুখপাত্র এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন।
গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণাকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে চলন্ত একটি মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।






























