সীতাকুণ্ডের জঙ্গলে সেই শিশুটির শ্বাসনালী কাটার নেপথ্যে কী?

সীতাকুণ্ডের জঙ্গলে সেই শিশুটির শ্বাসনালী কাটার নেপথ্যে কী? ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৭:২৮, ৩ মার্চ ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শ্বাসনালি কেটে হত্যাচেষ্টার শিকার হওয়া মেয়ে শিশুটি শেষ পর্যন্ত মারা গেছে।

শিশুটির চাচা জানিয়েছেন, রাত সাড়ে তিনটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।

রবিবার (১ মার্চ) শিশুটির মা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করেছিলেন। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিশুটির মৃত্যুর পর সেই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে।

ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে, যখন রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটির একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়।

পুলিশ, শিশুটির চাচা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে স্থানে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় পাওয়া যায় সেটি তার বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এবং ভূমি থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি এলাকা।

সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরে ওঠার সড়কের একটি অংশে সংস্কারকাজ চলছিল। গত রবিবার শিশুটি ওই দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে হেঁটে নিচে নামার সময়ও তার গলা থেকে রক্ত ঝরছিল বলে শ্রমিকরা স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। প্রথমে সে রাস্তার কাজে নিয়োজিত একটি এক্সকাভেটরের কাছে এসে কিছু বলার চেষ্টা করে।

কিন্তু শ্বাসনালি কাটা থাকায় তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। উপস্থিত শ্রমিকরা দ্রুত কাপড় দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা করেন এবং সেখানে থাকা বালুবাহী গাড়িতে করে তাকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে স্থানীয় এক সাংবাদিক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।

সেদিন রাতেই তার গলায় অস্ত্রোপচার করা হয়। পরদিন সোমবার সকালে তাকে হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেলে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে সে মৃত্যুবরণ করে।

শিশুটির চাচা আব্দুল আজিজ জানিয়েছেন, তাদের পরিবার সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরার মাস্টারপাড়ায় বসবাস করে। আর যেখানে তার ভাতিজিকে পাওয়া গেছে, সেটি ইকোপার্কের অনেক ভেতরের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। তিনি বলেন, “ওকে সেখানে কে নিয়ে গেল, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আমরা চাই ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হোক। নির্যাতনের কারণেই সে মারা গেছে। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

তিনি আরও জানান, শিশুটির বাবা শ্রমজীবী মানুষ। প্রায় আট বছর বয়সী শিশুটি তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। আব্দুল আজিজের ভাষায়, “সম্ভবত নির্যাতনের পর গলা কেটে তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। কীভাবে সে তখনও বেঁচে ছিল এবং ফেরার চেষ্টা করেছিল, তা ভাবতেই অবাক লাগে।”

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মইনুল ইসলাম বলেন, কীভাবে শিশুটি এত দূরের পাহাড়ি এলাকায় গেল এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, “আমাদের একটু সময় দিন। আমরা জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”

পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগে শিশুটির বাবা যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেলেও শিশুটি প্রায় প্রতিদিনই তার দাদীর কাছে যেত এবং চাচাদের বাড়িতে সময় কাটাত। দাদীর কাছে গেলে অনেক সময় সে নিজের বাড়িতে ফিরতে চাইত না, তখন বাবা-মাকে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে হতো।

শিশুটির চাচা আব্দুল আজিজ বিবিসিকে বলেন, “সেদিনও খুব সকালে সে মাকে বলেছিল খেলতে যাবে। মা তাকে ভাইকে সঙ্গে নিতে বলেছিলেন, কিন্তু সে একাই বের হয়ে যায়।

আমরা ধারণা করি, অন্য দিনের মতো হয়তো আমাদের বাড়ির দিকেই আসছিল। কিন্তু কীভাবে সে ওই দুর্গম পাহাড়ে পৌঁছাল এবং কে তাকে সেখানে নিয়ে গেল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় রহস্য।”

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement