কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল উদ্বোধন আগামী সপ্তাহে
Published : ১০:১৫, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত আন্তর্জাতিক টার্মিনাল আগামী সপ্তাহ থেকে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমনের জন্য চালু করা হবে। আগামী মাসে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নতুন টার্মিনাল চালুর এই উদ্যোগকে বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, আগামী সপ্তাহ থেকে নতুন টার্মিনালটি অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হবে।
গত বুধবার কক্সবাজার বিমানবন্দরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, বিমানবন্দরে পরিচালনাকারী সব অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনস নতুন টার্মিনালে তাদের যাত্রী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
প্রাথমিকভাবে বিমান ও টার্মিনাল ভবনের মধ্যে যাত্রী পরিবহনের জন্য এয়ারলাইনসগুলো গলফ কার্ট ব্যবহার করবে বলেও জানান তিনি। অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম চালুর পর আগামী মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে বলে জানান বেবিচক চেয়ারম্যান।
নভোএয়ারের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের পরিচালক সোহেল মজিদ বলেন, নতুন টার্মিনাল যাত্রী ব্যবস্থাপনার জন্য চালুর লক্ষ্যে তাদের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়েছে। নতুন টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য গলফ কার্ট মোতায়েনসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে যাত্রার প্রস্তুতি
নতুন টার্মিনাল নির্মাণ এবং বঙ্গোপসাগরের দিকে রানওয়ে সম্প্রসারণসহ ব্যাপক উন্নয়নকাজের পর সরকার আগামী মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এর আগে আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোও কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করবে।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বলেন, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হলে টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা একটি হাইব্রিড ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আগমন ও বহির্গমন—দুই ধরনের যাত্রীই নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করবেন। এরপর অভ্যন্তরীণ আগমনকারী যাত্রীরা পুরোনো টার্মিনাল ব্যবহার করবেন। অভ্যন্তরীণ বহির্গমনকারী যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন সম্পন্ন করে বোর্ডিংয়ের জন্য পুরোনো টার্মিনালে যাবেন।
৩৬২ কোটি টাকার টার্মিনাল
বেবিচকের বৃহত্তর উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের আন্তর্জাতিক টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
নতুন টার্মিনালে ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী ধারণক্ষমতার ডিপার্চার লাউঞ্জ, ডিউটি-ফ্রি শপ, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এসকেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন ডেস্ক, বহির্গমন ও আগমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং অ্যারাইভাল লাউঞ্জ রয়েছে।
বহির্গমনকারী যাত্রীদের জন্য চারটি এবং আগমনকারী যাত্রীদের জন্য ছয়টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আগমনকারী যাত্রীদের জন্য রয়েছে দুটি লাগেজ ডেলিভারি বেল্ট।
এ ছাড়া টার্মিনালে পাবলিক অ্যাড্রেস (পিএ) ও ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম (এফআইডিএস), সাইনেজ, সিসিটিভি এবং ভারী হাতব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সুবিধা রাখা হয়েছে।
সম্প্রসারণের পর বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাড়ানো হয়েছে রানওয়ের দৈর্ঘ্য
বিমানবন্দরের উন্নয়ন কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রানওয়ে সম্প্রসারণ। রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে। এ জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
সম্প্রসারিত রানওয়েটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ও বোয়িং ৭৪৭-৪০০সহ সম্পূর্ণ বোঝাই ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছে।
রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। চীনা যৌথ উদ্যোগ সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রের দিকে সম্প্রসারিত প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং এবং নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য ক্যাট-টু এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রানওয়েকে সুরক্ষিত রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ। পাশাপাশি নিরাপত্তা বেড়া, টহল সড়ক এবং ৮ হাজার ১৪৯ মিটার দীর্ঘ ড্রেনেজ ব্যবস্থাও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমানে কক্সবাজার বাংলাদেশের ব্যস্ততম অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর একটি। বিমানবন্দরটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা করে।
সরকারের প্রত্যাশা, কক্সবাজারের সঙ্গে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ চালু হলে বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে। একই সঙ্গে হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।



























