ফাইভারে অ্যাকাউন্ট কারসাজির অভিযোগ: বেটোপিয়াকে ঘিরে তদন্তে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
Published : ১৮:২৯, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভারকে ঘিরে অ্যাকাউন্ট কারসাজি, ভুয়া অর্ডার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বেটোপিয়া গ্রুপকে ঘিরে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কর্মীদের পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা, একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং পরিকল্পিতভাবে অর্ডার দিয়ে পরে তা বাতিল বা রিফান্ড করার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের র্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার চেষ্টা।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সময়ে ফাইভারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত কমিউনিটি ফোরামে অ্যাকাউন্ট ম্যানিপুলেশন, পরিচয় অপব্যবহার ও ভুয়া রিভিউয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে।
৩০০-এর কাছাকাছি অ্যাকাউন্ট স্থগিত
প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর জুলাইয়ের শেষ দিকে বেটোপিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০০টি ফাইভার অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে আরও কয়েক হাজার অ্যাকাউন্ট নজরদারি ও তদন্তের আওতায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফাইভারের নীতিমালা অনুযায়ী, অন্যের পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার এবং রিভিউ বা রেটিং কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করার মতো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। প্ল্যাটফর্মটি বলছে, গুরুতর বা বারবার নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট স্থগিত বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হতে পারে।
কর্মীদের পরিচয় ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলার অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে আকর্ষণীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ করা হতো। চাকরিতে যোগদানের সময় তাদের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হতো বলে কয়েকজন সাবেক কর্মী অভিযোগ করেছেন।
তাদের দাবি, কর্মীদের অজ্ঞাতে এসব পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খোলা এবং সেগুলো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করা হয়েছে। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ, কাজের জন্য বিড এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বেটোপিয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে ভুয়া অর্ডারের অভিযোগ
বেটোপিয়াকে ঘিরে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো—প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের গিগে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে পরিকল্পিতভাবে অর্ডার দেওয়া এবং পরে সেগুলো বাতিল বা রিফান্ড করা। অভিযোগকারীদের দাবি, এর ফলে সংশ্লিষ্ট ফ্রিল্যান্সারের পারফরম্যান্স ও মার্কেটপ্লেস র্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড ফাইভারের নীতিমালার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ফাইভারের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডে কৃত্রিমভাবে রেটিং বা লেভেল বাড়ানো এবং একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে রিভিউ বা রেটিং ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একজন ভুক্তভোগী ফ্রিল্যান্সারের অভিযোগ, তার অ্যাকাউন্টে দুটি অর্ডার আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো বাতিল হয়ে যায়। পরে তিনি অর্ডারগুলোর সঙ্গে বেটোপিয়ার সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অ্যাকাউন্টের যোগসূত্র পেয়েছেন বলে দাবি করেন।
কর্মীদের চাকরি ও কর্মপরিবেশ নিয়েও অভিযোগ
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেটোপিয়ার সাবেক কর্মীদের বরাতে নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে। কয়েকজনের দাবি, ফ্রেশারদের ট্রেইনি বা ইন্টার্ন হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর এক থেকে দুই মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মীকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কখনো পারফরম্যান্স, আবার কখনো মূল্যায়ন স্কোরকে চাকরি হারানোর কারণ হিসেবে দেখানো হলেও মূল্যায়নের মানদণ্ড সম্পর্কে আগে থেকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়নি বলে কয়েকজন সাবেক কর্মী অভিযোগ করেছেন।
এ ছাড়া একজন সাবেক কর্মী কর্মীদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং ফাইভারে ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তি তোলার পর তাকে হয়রানির অভিযোগও করেছেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাইয়ের বিষয়টি প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
ফাইভারের নীতিমালায় কী বলা আছে
ফাইভার তাদের বর্তমান নীতিমালায় ভুয়া পরিচয়, একাধিক অ্যাকাউন্ট, ফিডব্যাক ম্যানিপুলেশন এবং কৃত্রিমভাবে রেটিং বা পারফরম্যান্স প্রভাবিত করার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। প্ল্যাটফর্মটির ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত হলে অ্যাকাউন্টে বিধিনিষেধ আরোপ, কনটেন্ট অপসারণ কিংবা স্থায়ী সাসপেনশনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ফাইভারের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডে আরও বলা হয়েছে, ভুয়া রিভিউ বা কৃত্রিম এনগেজমেন্টের মাধ্যমে কোনো মার্কেটপ্লেসের আস্থা ও প্রতিযোগিতার পরিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
বেটোপিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বেটোপিয়া গ্রুপের সিইও মনির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। পরে প্রশ্ন পাঠানো হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পিআর ও মিডিয়া মুখপাত্র তানুভীরুল ইসলাম প্রশ্ন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে উত্তর দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়পত্রের অপব্যবহার, ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও কৃত্রিম অর্ডারের মতো কর্মকাণ্ড যেন দেশের বিপুলসংখ্যক বৈধ ফ্রিল্যান্সারের আন্তর্জাতিক সুনামকে প্রভাবিত না করে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।





























